বাংলাহান্ট ডেস্ক: হায়দ্রাবাদের তরুণী সাতভিকা পেন্ডামের সাফল্যের গল্প (Success Story) আজ বহু তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি শেষ করার পর যখন অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তখন সাতভিকা বেছে নিয়েছিলেন একেবারেই অন্য পথ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শুধু চাকরি নয়, নিজের স্বপ্নকেও সফল ব্যবসায় পরিণত করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘চিনোউ’ (Chinou) নামে একটি ডেজার্ট ব্র্যান্ড। মাত্র ৫,০০০ টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ কয়েক মিলিয়ন টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নাগালের মধ্যে প্রিমিয়াম মানের ডেজার্ট পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তিনি পথচলা শুরু করেছিলেন, আর আজ সেই স্বপ্নই তাঁকে সফল তরুণ উদ্যোক্তাদের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।
সাতভিকা পেন্ডামের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
২০২৩ সালে গোকরাজু কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে বি.টেক পড়ার সময় সাতভিকা বুঝতে পারেন, চিজকেক, ক্রোসাঁ বা অন্যান্য প্রিমিয়াম ডেজার্ট সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে। দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও এগুলি কিনতে পারতেন না। সমস্যার সমাধান খুঁজতেই তিনি বাড়িতে বাবা-মায়ের ওভেনে নানা রেসিপি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। হোম টিউশন করে জমানো মাত্র ৫,০০০ টাকা ছিল তাঁর প্রথম মূলধন। শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। রাতে হায়দরাবাদের রাস্তায় ছোট্ট স্টল বসিয়ে ডেজার্ট বিক্রি করতেন তিনি। মেয়ের ভবিষ্যৎ, স্বাস্থ্য এবং অনিশ্চিত ব্যবসা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তাঁর মা। পরিবারের ইচ্ছা ছিল সাতভিকা একটি নিরাপদ চাকরি করুন। কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে একটুও সরে আসেননি তিনি (Success Story)।
২০২৩ সালের আগস্টে হায়দ্রাবাদের ডিএলএফ এলাকায় একটি টেবিল, একটি ব্যানার এবং কয়েকটি ডেজার্টের বাক্স নিয়ে তিনি চালু করেন তাঁর প্রথম ‘টেবিল ক্যাফে’। প্রথম দিনেই বিক্রি হয় ১৫টি কেক। এরপর ইনস্টাগ্রামে তাঁর একটি রিল ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। সপ্তাহান্তে তাঁর স্টলের বিক্রি পৌঁছে যায় ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকায়। অল্প সময়ের মধ্যেই বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ লক্ষ টাকায় পৌঁছায়। এই সাফল্যের জোরে ২০২৪ সালে, এখনও বি.টেক-এর তৃতীয় বর্ষে পড়াকালীন, প্রায় ৪.৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি হায়দ্রাবাদের প্রথম ‘ডেজার্ট ট্রাক’ চালু করেন। রাত ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ৪৯ থেকে ১৫৯ টাকার মধ্যে ৫০টিরও বেশি ধরনের ডেজার্ট বিক্রি হতে থাকে, যা দ্রুত তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে এই সাফল্যের পিছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম। ব্যবসার জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়েছে তাঁকে। বহু দোকানমালিক ও বিক্রেতার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে। কারণ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিজকেক বিক্রির ধারণা তখন অনেকের কাছেই অচেনা ছিল। কিন্তু সাতভিকার আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রম ধীরে ধীরে পরিবারের মনও বদলে দেয়। বর্তমানে তাঁর মা বেকিংয়ের দায়িত্ব সামলান, বাবা ডেজার্ট ট্রাক পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা দেখেন, আর বড় ভাই নিজের চাকরি ছেড়ে পুরো সময়ের জন্য এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। সাতভিকার উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে হায়দরাবাদের বহু ছাত্রছাত্রী ও তরুণ উদ্যোক্তাও নিজেদের ছোট ব্যবসা শুরু করার সাহস পেয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে সাতভিকা জানান, তাঁর ব্যবসার সাফল্য দেখে অনেকেই বুঝেছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়াও সম্ভব।

আরও পড়ুন: শুধু ভারতেই নয়! বিশ্বের একাধিক দেশে ব্যবহৃত হয় ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল, তালিকায় রয়েছে বড় চমক
২০২৫ সালে বি.টেক-এর শেষ বর্ষে পড়ার সময় সাতভিকা প্রথম একটি ছোট আউটলেট চালু করেন, যাতে তাঁর ব্র্যান্ড সুইগি ও জোম্যাটোর মতো অনলাইন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মে জায়গা পায়। এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে হায়দরাবাদের আরটিসি এক্স রোডস এলাকায় ৬০০ বর্গফুটের একটি আধুনিক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাফে চালু করেন। এই ক্যাফে তৈরিতে মোট বিনিয়োগ হয় প্রায় ১৫ লক্ষ টাকারও বেশি এবং সেখানে একসঙ্গে প্রায় ২০ জন বসে খাবার উপভোগ করতে পারেন। বর্তমানে তাঁর ব্যবসার বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে এবং প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। এখানেই থেমে থাকতে চান না সাতভিকা। আগামী দিনে ব্যবসার পুরো মডেলকে স্বয়ংক্রিয় করা, দেশের বিভিন্ন শহরে ফ্র্যাঞ্চাইজি সম্প্রসারণ এবং আরও বেশি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন ডেজার্ট পৌঁছে দেওয়াই তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য (Success Story)।













