বাংলাহান্ট ডেস্ক: ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু হরমুজ প্রণালী নয়, এবার লোহিত সাগরকেও (Red Sea) ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে তেহরান লেবানন-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীকে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও এই বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও এমন সম্ভাবনার খবর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি লোহিত সাগরও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস এবং পণ্য পরিবহণ করা হয়।
হরমুজের পর এবার লোহিত সাগর (Red Sea) বন্ধ করার পরিকল্পনা ইরানের
সংঘাতের আবহে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার খবর সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রেল স্টেশন, বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ একাধিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে এবং এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, তার প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয় এবং একাধিক সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে। ফলে জ্বালানির দাম থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে (Red Sea)।
আরও পড়ুন: বাবার আপত্তি পেরিয়ে স্বপ্নপূরণ, মার্চেন্ট নেভিতে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়লেন ১৮ বছরের তানভী!
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল সত্যিই ব্যাহত হয়, তাহলে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সুয়েজ খাল হয়ে লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক করিডর। ভারত থেকেও ইউরোপে পণ্য পাঠানোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও অর্থনৈতিক জলপথ এটি। এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজগুলিকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। এতে পরিবহণ খরচ যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, তেমনি পণ্য পৌঁছাতে সময়ও অনেক বেশি লাগবে। আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে এবং বীমা খরচও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি ভারতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ইউরোপ থেকে বিভিন্ন শিল্প যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, রাসায়নিক দ্রব্য এবং উৎপাদন শিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করে। লোহিত সাগরের রুটে সমস্যা তৈরি হলে এই আমদানির উপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পেতে বিলম্ব হতে পারে, যার ফলে শিল্প উৎপাদনের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহণ ব্যয় বেড়ে গেলে বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার উপর পড়বে এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন: মৃতদের নথির অপব্যবহার ঠেকাতে কড়া পদক্ষেপ! জন্ম-মৃত্যুর রেজিস্ট্রেশন আইনে বড় সংশোধন আনছে কেন্দ্র
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগই একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ততই বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশ পরিস্থিতির উপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে মত দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর (Red Sea) এই দুই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতির উপরও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। তাই যুদ্ধের বিস্তার রোধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।













