বাংলাহান্ট ডেস্ক: দিনের বেশির ভাগ সময় কেটে যেত অ্যাম্বুলেন্সের স্টিয়ারিংয়ে। টানা ১২ ঘণ্টার ডিউটির পর শরীর যখন ক্লান্ত, তখনও শুধুমাত্র জীবনে সাফল্য (Success Story) হাসিলের লক্ষ্যে বই খুলে বসতেন নদিয়ার গাঙনাপুরের দেবজিৎ ভদ্র (Debjit Bhadra)। লক্ষ্য ছিল একটাই—ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ISRO-তে কাজ করা। আর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তাঁকে পেরোতে হয়েছে অভাব, সময়ের সংকট এবং একাধিক ব্যর্থতা। শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালানোর চাকরি সামলানোর পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল মিলেছে। ISRO-তে ‘টেকনিশিয়ান বি’ পদে নির্বাচিত হয়েছেন দেবজিৎ।
দেবজিৎ ভদ্রের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
দেবজিতের মহাকাশের প্রতি আগ্রহ নতুন নয়। বিশেষ করে চন্দ্রযান অভিযানের সাফল্য তাঁকে গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। দেশের মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা তখন থেকেই আরও জোরালো হয়। কিন্তু তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সময়। নিয়মিত চাকরির কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হত। ফলে আলাদা করে পড়াশোনার জন্য খুব বেশি সময় পাওয়া যেত না। সেই পরিস্থিতিতেই ইউটিউবের শিক্ষামূলক ভিডিয়ো, বিভিন্ন কোচিংয়ের সাহায্য এবং নিজের অধ্যবসায়কে ভরসা করে প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। কাজের ফাঁকে যতটুকু সময় পেতেন, সেটুকুই কাজে লাগাতেন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। কখনও ক্লান্তি তাঁকে থামিয়েছে, কখনও পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে, কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরে যাননি (Success Story)।
আরও পড়ুন: উৎসবের মরসুমে চিনির দামে আগুন! কালোবাজারি রুখতে আমদানিতে কেন্দ্রের কড়া নিয়ম
তবে সাফল্য একবারেই আসেনি। ISRO-তে যাওয়ার পরীক্ষায় দেবজিৎ একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছেন। পাঁচ-ছ’বার পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পাওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতাকে নিজের প্রস্তুতির খামতি বোঝার সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন। কোথায় ভুল হচ্ছে, কীভাবে আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়া যায়—সেই হিসাব করে আবার পড়াশোনায় ফিরেছেন। অন্যদিকে প্রতিদিনের চাকরিও চলেছে একই ভাবে। অ্যাম্বুলেন্স চালানোর দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইটাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে সাফল্যের মুখ দেখিয়েছে। একাধিক ব্যর্থতার পর অবশেষে ISRO-তে চাকরির সুযোগ পেয়ে যায় তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম।
দেবজিতের নতুন কর্মজীবনের ঠিকানা হতে চলেছে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার। ‘টেকনিশিয়ান বি’ পদে সেখানে যোগ দেবেন তিনি। এতদিন যে মানুষটি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন, এবার সেই মানুষই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশকেন্দ্রে কাজ করবেন। তাঁর এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে পরিবারে। মা চায়না ভদ্রের কাছে ছেলের এই সাফল্য বহু বছরের সংগ্রামের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। বাবা দীপক ভদ্র এবং স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা ভদ্রও দেবজিতের এই অর্জনে গর্বিত। পরিবারের কথায়, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জেদটাই শেষ পর্যন্ত দেবজিতকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: দিল্লিতে পুতিন-মোদী বৈঠকের সম্ভাবনা! রুশ প্রেসিডেন্টকে ব্রিকসের আমন্ত্রণ ভারতের
দেবজিতের গল্প তাই শুধু চাকরি পাওয়ার সাফল্যের গল্প (Success Story) নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে থাকার এক অনুপ্রেরণার গল্প। যাঁদের হাতে সীমিত সুযোগ, যাঁদের প্রতিদিন কাজের চাপের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা করতে হয়, তাঁদের কাছেও এই ঘটনা বিশেষ বার্তা বহন করে। সাফল্যের পথ সবসময় মসৃণ হয় না—কখনও সেখানে ব্যর্থতা আসে, কখনও সময়ের অভাব, কখনও আর্থিক সমস্যাও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু লক্ষ্য স্থির রেখে চেষ্টা চালিয়ে গেলে সেই বাধাগুলিই একদিন পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব। দিনে ১২ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স চালানোর পর বই নিয়ে বসা সেই দেবজিৎ ভদ্রই আজ ISRO-র নতুন কর্মী। তাঁর এই যাত্রা আরও একবার মনে করিয়ে দিল, বড় স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে নিজের উপর বিশ্বাস এবং হার না মানার জেদ।













