বাংলাহান্ট ডেস্ক: দক্ষিণ চিন সাগর ঘিরে চিনের (China) সঙ্গে একাধিক দেশের দীর্ঘদিনের বিবাদ। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বাড়াচ্ছে ভারত (India)। সরাসরি দক্ষিণ চিন সাগরে সামরিক উপস্থিতি না বাড়িয়েও উপকূলবর্তী বন্ধু দেশগুলির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার মাধ্যমে চিনের উপর চাপ তৈরির পথ নিয়েছে নয়াদিল্লি। আর এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের তৈরি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রহ্মস (BrahMos)। ইতিমধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিনটি দেশ ভারতের কাছ থেকে ব্রহ্মস কিনেছে। এবার সেই তালিকায় থাইল্যান্ডের নাম যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল পিআর শংকর সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘তাইওয়ান টকস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই সম্ভাব্য কৌশলের কথাই তুলে ধরেছেন।
দক্ষিণ সাগরে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বাড়াচ্ছে ভারত (India)
দক্ষিণ চিন সাগরের উপকূলে থাকা দেশগুলির সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে ফিলিপিন্স প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ব্রহ্মসের উপকূলভিত্তিক ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছিল। এরপর ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াও ভারতের (India) সঙ্গে ব্রহ্মস নিয়ে চুক্তিতে এগিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গেও এই ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে। এই দেশগুলির প্রত্যেকটিরই দক্ষিণ চিন সাগরের সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে এবং চিনের সামুদ্রিক দাবির কারণে তাদের সঙ্গে বেজিংয়ের টানাপড়েন রয়েছে। ফলে ব্রহ্মস শুধু অস্ত্র বিক্রির বিষয় নয়, এর সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণও জড়িয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: রেলের ‘মহাসড়ক’ এবার চার লাইনের! ৭ হাই-ডেনসিটি করিডোরে কেন্দ্রের বড়সড় পরিকল্পনা
পিআর শংকরের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ চিন সাগরকে ঘিরে একটি ‘ব্রহ্মস বেল্ট’-এর মতো প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, এর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র চিনকে লক্ষ্য করা নয়; বরং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলির প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। এই ব্যবস্থাকে কোনও আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ চিন সাগর সংক্রান্ত বিরোধে থাকা দেশগুলির ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের একটি চিত্র হিসেবেই একে দেখা হচ্ছে। ফলে ভারত নিজে সেখানে বড় কোনও সামরিক বাহিনী মোতায়েন না করেও মিত্র দেশগুলির হাতে এমন একটি অস্ত্র তুলে দিচ্ছে, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রহ্মসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুতগতি, নির্ভুলতা এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্যবহারের সক্ষমতার জন্য পরিচিত। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় ব্রহ্মসের ব্যবহারের দাবি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক মহলেও অস্ত্রটি নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে বলে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহলে আলোচনা শুরু হয়। শংকরের মতে, ব্রহ্মসের কার্যক্ষমতা নিয়ে চিনও অবগত। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের হাতে এই ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছনোর অর্থ হল, চিনের সামুদ্রিক পরিসরের কাছাকাছি ভারতীয় প্রযুক্তির প্রতিরোধ ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়া।

আরও পড়ুন: সমুদ্রের তলায় ‘বিপদ’! একটিমাত্র নোঙরেই বিচ্ছিন্ন হতে পারে ভারতের ইন্টারনেট সংযোগ
দক্ষিণ চিন সাগরকে ঘিরে এই সমীকরণ যে কেবল সামরিক বিষয় নয়, তার পিছনে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থও। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। চিন দক্ষিণ চিন সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চলের উপর সার্বভৌমত্বের দাবি করে আসছে। সেই দাবির বিরোধিতা করে ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই এবং তাইওয়ান-সহ একাধিক পক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে চিনের টহল ও সামুদ্রিক তৎপরতা বাড়ায় উত্তেজনাও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে উপকূলীয় দেশগুলির প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নয়াদিল্লির প্রভাব বাড়তে পারে। তাই ‘ব্রহ্মস বেল্ট’ এখন শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র রফতানির গল্প নয়, বরং দক্ষিণ চিন সাগরে ভারতের (India) নয়া কৌশলগত উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।













