সমুদ্রের তলায় ‘বিপদ’! একটিমাত্র নোঙরেই বিচ্ছিন্ন হতে পারে ভারতের ইন্টারনেট সংযোগ

Published on:

Published on:

Follow

বাংলাহান্ট ডেস্ক: আজকের দুনিয়ায় ইন্টারনেট (Internet) ছাড়া এক মুহূর্তও যেন ভাবা যায় না। প্রিয়জনের সঙ্গে ভিডিও কল থেকে শুরু করে অফিসের জুম মিটিং, অনলাইন ব্যাঙ্কিং, ডিজিটাল পেমেন্ট কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিনোদন—জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজই নির্ভরশীল এই সংযোগ ব্যবস্থার উপর। কিন্তু এই নির্ভরতার মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে বড়সড় ঝুঁকি। কোনও কারণে দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে রাতারাতি তৈরি হতে পারে ভয়াবহ পরিস্থিতি। সেই আশঙ্কার মধ্যেই অবশ্য কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। সমুদ্রের তলা দিয়ে নতুন সাব-সি কেবল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে ভারত, যা দেশের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সংযোগকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

নতুন সাব-সি কেবল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে ভারত, তবু ইন্টারনেট (Internet) পরিষেবা নিয়ে সংশয়

‘I-2SEA’ নামে এই নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে হায়দ্রাবাদের সঙ্গে সরাসরি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সংযোগ তৈরি হবে। শুধু সাধারণ ইন্টারনেট পরিষেবাই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নির্ভর প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ ডেটা দ্রুত আদান-প্রদানেও এই কেবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। প্রকল্পটির সঙ্গে রয়েছে মাইক্রোসফট, টাটা কমিউনিকেশনস, জাপানের NEC এবং সিঙ্গাপুরের Singtel-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা। ফলে ভারতের ডিজিটাল পরিকাঠামোয় এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তবে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, একটি নতুন কেবল যুক্ত হলেই দেশের সাব-সি কেবল ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা পুরোপুরি কাটবে না। বরং বর্তমান পরিকাঠামোর বেশ কিছু মৌলিক সমস্যার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন: মরক্কোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা বন্ধন আরও মজবুত ভারতের! যৌথ উৎপাদন ও সামরিক প্রশিক্ষণে বাড়ছে অংশীদারিত্ব

ভারতের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ দেশের পরিকাঠামোর উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বিশ্বের মোট সাব-সি কেবল নেটওয়ার্কের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ ভারতে রয়েছে। দেশের ডিজিটাল নির্ভরতার তুলনায় এই পরিকাঠামো যথেষ্ট নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তার থেকেও বড় উদ্বেগ কেবলের অবস্থান নিয়ে। ভারতে আসা ১৮টি আন্তর্জাতিক কেবলের মধ্যে অন্তত ১৩টি মুম্বইয়ের উপকূলের মাত্র প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অংশে এসে মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কোনও বড় ধরনের সমস্যা হলে তার প্রভাব একসঙ্গে একাধিক আন্তর্জাতিক কেবলের উপর পড়তে পারে। জাহাজের নোঙর, সমুদ্রের নীচে নির্মাণকাজ বা ইচ্ছাকৃত নাশকতার মতো ঘটনাও তখন বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সমস্যা শুধু কেবলের ঘনত্বেই নয়, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত মেরামতের ক্ষেত্রেও ভারতের যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় মালিকানাধীন বা ভারতীয় জলসীমায় নিয়মিত মোতায়েন থাকা কোনও বিশেষায়িত সাব-সি কেবল মেরামতকারী জাহাজ নেই। ফলে কেবল ছিঁড়ে গেলে বিদেশি মেরামতকারী জাহাজের উপর নির্ভর করতে হয়। সাধারণত সিঙ্গাপুর বা দুবাই থেকে এই ধরনের জাহাজ আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পরিস্থিতি ও ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী সেই প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে, যা ডিজিটাল পরিষেবার উপর নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যাহত হলে ব্যাঙ্কিং, ব্যবসা, ক্লাউড পরিষেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায় তার প্রভাব পড়তে পারে।

India is set to connect to a new subsea cable network, yet doubts remain regarding internet services.

আরও পড়ুন:প্রযুক্তিগত গোলযোগে ব্রিটেনে বিমান বিপর্যয়!বাতিল ১,০০০-এর বেশি ফ্লাইট, চরম দুর্ভোগ যাত্রীদের

তবে এই সমস্যার সমাধানের জন্য শুধুমাত্র সরকারি অর্থেই বিশাল মেরামতকারী বহর তৈরি করতে হবে, এমনটা নয়। বেসরকারি সংস্থাগুলিও যৌথভাবে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। একটি সংস্থার নিজস্ব কেবল মেরামতকারী জাহাজ হয়তো বছরের বড় সময়ই অব্যবহৃত থাকবে। কিন্তু একাধিক কেবল মালিক সংস্থা মিলে একটি যৌথ মেরামত পরিষেবা তৈরি করলে সেটি অনেক বেশি কার্যকর এবং অর্থনৈতিক হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এমন মডেলের নজির রয়েছে। কিন্তু ভারতের জলসীমায় এখনও এই ধরনের যৌথ উদ্যোগ কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। এর পিছনে লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মতো বিষয়ও রয়েছে, যেগুলির ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। ফলে I-2SEA নিঃসন্দেহে আশার আলো দেখালেও, দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল নতুন কেবল বসানোই যথেষ্ট নয়। মেরামত পরিকাঠামো, কেবলের বৈচিত্র্যময় অবতরণস্থল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা তৈরি না হলে ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে (Internet)।