বাংলা হান্ট ডেস্ক : আইএমএ-র (IMA Account) একটি বিতর্কিত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের প্রসঙ্গে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি তথা প্রাক্তন বিধায়ক সুদীপ্ত রায় এবং প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু সেনের মধ্যে পুরনো সংঘাত নতুন করে সামনে আসছে। প্রায় দেড় কোটি টাকার লেনদেনের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরেও কেন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা হয়নি, সেই প্রশ্ন তুলেছেন সুদীপ্ত। অন্য দিকে, শান্তনুর দাবি, মেডিক্যাল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে তাঁর সরব হওয়ার জেরেই বহু পুরনো বিষয় ফের টেনে আনা হচ্ছে।
আইএমএ (IMA)-র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লেনদেন নিয়ে সংঘাত
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের জুনে ‘জার্নাল অফ দ্য ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘জিমা’র নামে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। আইএমএ-র প্যান ব্যবহার করেই সেটি খোলা হলেও সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে অভিযোগ। রাজ্য শাখাতেও বিষয়টি সম্পর্কে সীমিত সংখ্যক মানুষ অবগত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে । সেই সময় অ্যাকাউন্ট পরিচালনার ক্ষমতা ছিল ‘জিমা’র তৎকালীন সম্পাদক শান্তনু সেন এবং যুগ্ম অর্থসচিব উজ্জ্বল সেনগুপ্তের হাতে।
পরে ২০১৭-১৮ সালে কাকলি সেন ‘জিমা’র সম্পাদক হন। তিনি শান্তনুর স্ত্রী। সেই পর্যায়ে শান্তনু যুগ্ম অর্থসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। তদন্তে যে আর্থিক হিসাব সামনে এসেছে, তাতে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ওই অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল ১ কোটি ৫৩ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি ৩২ লক্ষ টাকা তুলে নেওয়া হয়। নগদে তোলা হয়েছিল ২৯ লক্ষ টাকা। অভিযোগ, নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্ধারিত বিধিও মানা হয়নি।
তবে এত বড় অঙ্কের লেনদেন সত্ত্বেও অ্যাকাউন্টটির অস্তিত্ব বেশ কিছু বছর প্রকাশ্যে আসেনি। ২০২০ সালে ১৭ লক্ষ ও ১ লক্ষ টাকার দুটি চেকের মাধ্যমে অর্থ তোলার চেষ্টা হলে, দুটি চেকই ব্যাঙ্কে আটকে যায়। কারণ, এই ধরনের অ্যাকাউন্টে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘সাইনিং অথরিটি’ পরিবর্তন করা প্রয়োজন। অভিযোগ, ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সেই পরিবর্তন হয়নি। এমনকি ওই সময় স্বাক্ষর করার অধিকার থাকা ব্যক্তিরা ‘জিমা’র কোনও পদে ছিলেন না বলেও তদন্তে প্রশ্ন ওঠে।
এর পরেই আইএমএ গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি তৈরি করে। তদন্তে জানা যায়, অ্যাকাউন্টটির অস্তিত্ব প্রকাশ না করার জন্য হিসাবরক্ষক-সহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ভয় দেখানো হয়েছিল। জিমার অডিটরও তদন্তকারীদের জানান, এই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তাঁকে কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। তদন্তকারীদের নজরে আসে ‘দিশা মেডিহেল্প’নামে একটি সংস্থার নামও।ওই সংস্থার অফিসও শান্তনুর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হত। ১৭ লক্ষ টাকার একটি চেক ওই সংস্থার উদ্দেশে দেওয়া হয়েছিল এবং তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন উজ্জ্বল সেনগুপ্ত।
এখানেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন—অ্যাকাউন্টে আসা অর্থের উৎস কী ছিল, কেন সংগঠনের ভিতরেই বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল এবং ‘দিশা মেডিহেল্প’-এর কাছে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে কত টাকা বা কত বার অর্থ পাঠানো হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে, আইএমএ-র শিলিগুড়ি শাখার সচিব সজল বিশ্বাস বলেন, “এই সব প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে না-পারলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তদন্ত কমিটির রিপোর্টেই বলা আছে।”কিন্তু রিপোর্ট জমা পড়ার পর প্রায় এক বছর হতে চললেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, শান্তনুর দাবি, সম্প্রতি পাঁচ জন ভুয়ো চিকিৎসকের নাম সামনে আসার পর রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই, পুরনো বিষয়ে সামনে আনা হচ্ছে।
‘জিমা’র বর্তমান সম্পাদক মধুছন্দা কর বলেন, “আইএমএ-র প্যান ব্যবহার করে জিমার কনফারেন্সের জন্য অ্যাকাউন্ট খোলা ঠিক কাজ হয়েছে কি না বলতে পারব না। আইএমএ কাকে দোষী সাব্যস্ত করবে, কী ব্যবস্থা নেবে, তা তো আইএমএ-ই বলবে। যত দূর জানি, অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকা ২১ লক্ষ টাকা দিল্লিতে জিমার একটা বাড়ি তৈরির তহবিলে দিয়ে ওই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।” অন্য দিকে শান্তনুর দেওয়া হিসাব বলছে, ফেরত দেওয়া অর্থের পরিমাণ ২১ লক্ষ ৭৩ হাজার ৮৪৯ টাকা। ফলে বাকি বিপুল অর্থের হিসাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। তদন্ত রিপোর্টে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে আইএমএ আদৌ কোনও পদক্ষেপ করবে কি না, আর করলে তার পরিধি কতটা হবে—এখন সেটাই দেখার।