আমেরিকায় পেট্রোলের দামে ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি! ভারতে মাত্র ৮ শতাংশ, ইরান যুদ্ধের ধাক্কা কীভাবে সামলাল দেশ?

Published on:

Published on:

Follow

বাংলা হান্ট ডেস্ক: ইরান যুদ্ধ (Iran War) ও পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, ভারত (India) সহ বিভিন্ন দেশে তার প্রভাব স্পষ্ট পেট্রোল ও ডিজেলের দামে (Petrol-Diesel Price)। অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় একাধিক দেশে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। তবে একই সময়ে ভারতের বাজারে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির হার তুলনামূলক ভাবে কম বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন হিসাব ও প্রতিবেদনে। আপনার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে বৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশ, চিনে ১৭ শতাংশ, রাশিয়ায় ১৩ শতাংশ এবং আমেরিকায় প্রায় ৪৯ শতাংশ। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে এতটা অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারতের সাধারণ গ্রাহকের উপর তার ধাক্কা তুলনায় কম পড়ল কীভাবে? এর পিছনে রয়েছে জ্বালানি মূল্যনীতি, আমদানির উৎসে পরিবর্তন এবং দেশের বড় রিফাইনারিগুলির ভূমিকা।

যুদ্ধের আবহে বিভিন্ন দেশের চেয়ে ভারতে (India) পেট্রোলের দাম কম ছিল কি করে?

এই পরিস্থিতিতে ভারতের (India) জ্বালানি নীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক কমানো। মার্চে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে অপরিশোধিত তেলের দাম এক মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১২২ ডলারের কাছাকাছি চলে যায়। সেই সময় পেট্রোল ও ডিজেলের উপর আবগারি শুল্ক লিটারে ১০ টাকা করে কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্র। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলির উপর বাড়তে থাকা আর্থিক চাপ কিছুটা সামলানো এবং খুচরো দামে তেলের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো প্রভাব পড়তে না দেওয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই শুল্ক ছাড়ের পুরোটা পাম্পের দামে কমতি হিসেবে যায়নি; বরং তেল সংস্থাগুলির বাড়তি খরচ ও ক্ষতির চাপ সামলাতেও তা ব্যবহার করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: ভারতের নাগরিক হওয়ার আগেই নাম ভোটার তালিকায়! সোনিয়া গান্ধীর চাপ বাড়িয়ে কী জানাল আদালত?

এর পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল কেনার ক্ষেত্রেও ভারত পরিস্থিতি অনুযায়ী উৎস বদলেছে। পশ্চিম এশিয়া থেকে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সময় রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। জুলাই ২০২৬-এ রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছয়। বিভিন্ন বাণিজ্যিক তথ্য অনুযায়ী, সেই মাসে রাশিয়ার তেলের অংশ ভারতের মোট আমদানির অর্ধেকেরও বেশি ছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে অস্থিরতার মধ্যেও ভারতীয় রিফাইনারিগুলি বিকল্প উৎস থেকে প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করতে পেরেছে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ অন্যান্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও আমদানি বজায় ছিল। তবে রাশিয়ার তেলের ছাড় সবসময় একই মাত্রায় থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে সেই ছাড় কমে যাওয়ার খবরও সামনে এসেছে।

ভারতের আর একটি বড় সুবিধা হল তার শক্তিশালী রিফাইনিং পরিকাঠামো। দেশের রিফাইনারিগুলি আমদানি করা অপরিশোধিত তেলকে পেট্রোল, ডিজেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যে পরিণত করে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও একটি উৎসে চাপ তৈরি হলে অন্য জায়গা থেকে তেল এনে তা প্রক্রিয়াজাত করার কিছুটা flexibility থাকে। এই কারণেই ভারতের জ্বালানি বাজারকে শুধু অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা দিয়ে বিচার করা যায় না। অন্যদিকে আমেরিকার মতো বাজারে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দামের পরিবর্তনের প্রভাব খুচরো বাজারে তুলনামূলক দ্রুত পৌঁছতে পারে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আমেরিকাতেও মূল চাপ শুধু পেট্রোল নয়, ডিজেলের বাজারে বেশি দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ার রিফাইনারিগুলিতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা এবং অন্যান্য সরবরাহ বিঘ্নের কারণে বিশ্বজুড়ে ডিজেলের জোগানও চাপে পড়েছে।

How was the price of petrol lower in India than in other countries during the war?

আরও পড়ুন: মধ্যবিত্তের মুখে হাসি? পুজোর আগেই LPG-র দাম কমার সম্ভাবনা

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত (India) সম্পূর্ণ নিরাপদ। দেশের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে সরবরাহ ব্যাহত হলে কিংবা রাশিয়ার তেলের দাম ও ছাড়ের সমীকরণ বদলে গেলে ভারতের আমদানি খরচ বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম, পরিবহণ খরচ, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনও কাটেনি—সেপ্টেম্বরেও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সরবরাহ ঘাটতি ও উচ্চ দামের আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা। ফলে আপাতত করনীতি, আমদানির বৈচিত্র্য এবং শক্তিশালী রিফাইনিং ব্যবস্থা ভারতকে ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করলেও, দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক তেল-সংকটের প্রভাব থেকে দেশ কতদিন তুলনামূলক ভাবে দূরে থাকতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।