বাংলহান্ট ডেস্ক: নেপালের (Nepal) পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ হ্রদ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর এবার ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে চারটি হিমবাহ হ্রদের (Glacial Lake) জলস্তর নামানোর কাজ শুরু করেছে নেপাল। কিন্তু তাতেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কারণ, আরও ১৭টি হিমবাহ হ্রদকে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই হ্রদগুলির কোনওটির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে আচমকাই বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসতে পারে পাহাড় থেকে। তার জেরে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২৬ আগস্টের বিপর্যয়ের স্মৃতি এখনও টাটকা থাকায় নতুন করে এই হ্রদগুলির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিপর্যয় এড়াতে নেপালের (Nepal) ৪ হিমবাহ হ্রদ থেকে কমানো হচ্ছে জল!
নেপালের (Nepal) এই পরিস্থিতির প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের নদী অববাহিকাগুলিতে হঠাৎ জলস্তর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২০ সালে ICIMOD এবং রাষ্ট্রসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি UNDP-র যৌথ সমীক্ষায় কোশী, গণ্ডকী ও কর্ণালী অববাহিকা জুড়ে ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে নেপালে ২১টি, চিনের তিব্বত অঞ্চলে ২৫টি এবং ভারতে একটি হ্রদ রয়েছে। গবেষণায় এই হ্রদগুলির বাঁধ ভেঙে গেলে Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF-এর মতো আকস্মিক বন্যার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: UPI-তে অতিরিক্ত ফি বসতেই নগদ লেনদেনে ফিরতে চান ৭৬ শতাংশ ক্রেতা! কী বলছে সমীক্ষা?
ভারতের যে হ্রদটিকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে, সেটি কালী বা মহাকালী নদীর অববাহিকায় উত্তরাখণ্ডের দিকে অবস্থিত। সেটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণির মধ্যে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। হিমবাহ গলে জল জমে হ্রদের আয়তন বাড়তে থাকলে এবং প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে বিপুল জলরাশি নীচের দিকে নেমে আসতে পারে। কালী নদী উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এই ধরনের বিপর্যয়ের প্রভাব ওই অঞ্চলেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে নেপালের কোশী ও গণ্ডকী অববাহিকায় কোনও বড় হিমবাহ হ্রদ ভেঙে গেলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের সমতল এলাকায় পৌঁছতে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে নেপাল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হ্রদের জলস্তর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সোলুখুম্বুর লুমডিং শো, হোঙ্গু-২, সংখুয়াসভার লোয়ার বরুণ এবং মানাংয়ের থুলাগি—এই চারটি হ্রদকে কেন্দ্র করে জল কমানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের রিপোর্টেও হিমবাহ হ্রদগুলিকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জলস্তর কমানোর মতো পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। তবে সব জায়গায় কাজ একই গতিতে এগোয়নি। কোথাও যেখানে ১০ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত জল কমানোর প্রয়োজন ছিল, সেখানে অর্থ ও পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে তুলনামূলক কম জল নামানো সম্ভব হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন: লিটার প্রতি ১৬ টাকা বাড়ল ATF-এর দাম! বিমানভাড়ায় হবে বৃদ্ধি?
সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা হল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। হিন্দুকুশ হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলতে থাকায় নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হচ্ছে, আবার পুরনো হ্রদগুলির আয়তনও বাড়ছে। ICIMOD-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালের ওই সমীক্ষায় সংশ্লিষ্ট তিনটি অববাহিকায় ৩,৬২৪টি হিমবাহ হ্রদ শনাক্ত হয়েছিল, যার মধ্যে ২,০৭০টি নেপালে (Nepal)। এগুলির মধ্যে ৪৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং ৩১টি সর্বোচ্চ ঝুঁকির Rank-I শ্রেণিতে পড়েছিল। ফলে চারটি হ্রদের জল কমানোর কাজ শুরু হলেও নেপালের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে। পাহাড়ে জমে থাকা এই বিপুল জলরাশি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং সীমান্ত পেরিয়ে ভারত-নেপালের সমন্বিত প্রস্তুতিই ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় এড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।













