ফের উত্তপ্ত হরমুজ! ট্যাঙ্কারে লিমপেট মাইন বিস্ফোরণ, প্রাণে বাঁচলেন ২৭ ভারতীয়

Published on:

Published on:

Limpet mine explosion on a tanker in the Strait of Hormuz.

বাংলাহান্ট ডেস্ক: হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) ফের উত্তেজনা। এবার ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে বিস্ফোরক হামলার ঘটনায় সামনে এল জলযুদ্ধের এক পুরনো অথচ ভয়ংকর অস্ত্র ‘লিমপেট মাইন’ (Limpet Mine)। শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, পানামার পতাকাবাহী একটি তেলের ট্যাঙ্কারে এই বিস্ফোরণ ঘটে। জাহাজটিতে ছিলেন ২৭ জন ভারতীয় নাবিক। বিস্ফোরণের জেরে ট্যাঙ্কারের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেটি বিকল হয়ে মাঝসমুদ্রে থমকে পড়ে। তবে স্বস্তির খবর, জাহাজে থাকা কোনও ভারতীয় নাবিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। কেন্দ্রীয় জাহাজমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল জানিয়েছেন, সকলেই নিরাপদে রয়েছেন। ইরান-আমেরিকা সংঘাতের (Iran-America War) আবহে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াত ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পরপর দু’দিনে ভারতীয় নাবিকদের বহনকারী দুটি জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

হরমুজে (Strait of Hormuz) ট্যাঙ্কারে লিমপেট মাইন বিস্ফোরণ, অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেন ২৭ ভারতীয়

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের এক্স হ্যান্ডলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবারও হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) হামলার মুখে পড়েছিল লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বড় তেলের জাহাজ। সেটিতে দু’জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। প্রোজেক্টাইল বিস্ফোরণের ঘটনার পর তাঁদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। এর ঠিক পরের দিন, ৩০ অক্টোবর শুক্রবার, MT LOUISE 1 নামে পানামার পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারটি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় বিস্ফোরণের শিকার হয়। জাহাজটিতে ২৭ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। পরপর দু’দিনে দুটি জাহাজে হামলার ঘটনায় মোট ২৯ জন ভারতীয় নাবিক বিপদের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই নিরাপদে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, হরমুজে পরিস্থিতির উপর কেন্দ্রীয় সরকার নিয়মিত নজর রাখছে এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ২৫ বছর চাকরির পর শুরু পরিবেশবান্ধব ব্যবসা! তাতেই বাজিমাত বিনয়ের, মিলছে ৩৫ লক্ষের টার্নওভার

কিন্তু এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়েছে ‘লিমপেট মাইন’ নিয়ে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আকারে ছোট হলেও এই ধরনের বিস্ফোরক যথেষ্ট বিপজ্জনক। দেখতে অনেকটা ছোট সামুদ্রিক শামুকের মতো হওয়ায় এর নাম হয়েছে লিমপেট। সাধারণত জাহাজের গায়ে চৌম্বকীয় ব্যবস্থার সাহায্যে আটকে দেওয়া যায় এই বিস্ফোরক। জাহাজের মূল কাঠামোকে লক্ষ্য করেই এর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ফলে জাহাজের গায়ে বড়সড় ক্ষতি হতে পারে। প্রচলিত নৌ-অস্ত্রের তুলনায় আকারে ছোট হওয়ায় এগুলিকে সহজে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। সমুদ্রের বিভিন্ন গভীরতায় এই ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহারের নজিরও রয়েছে। তবে হরমুজের সাম্প্রতিক ঘটনায় ঠিক কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি।

লিমপেট মাইনের ইতিহাসও বেশ পুরনো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে এই ধরনের বিস্ফোরক তৈরির ভাবনা সামনে আসে। ব্রিটিশ সেনার একটি বিশেষ ইউনিটের প্রধান জো হল্যান্ড ছোট আকারের এমন একটি বিস্ফোরক তৈরির পরিকল্পনা করেন, যা সরাসরি শত্রুপক্ষের জাহাজের গায়ে লাগানো সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় লিমপেট মাইন। ভারী অস্ত্র বা বড়সড় বিস্ফোরক নিয়ে সমুদ্রে অভিযান চালানোর বদলে ছোট আকারের বিস্ফোরক ব্যবহারের এই কৌশল সামরিক ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন নৌ-সংঘাত ও গোপন অভিযানে এই ধরনের বিস্ফোরকের ব্যবহার দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে বন্দর এলাকায় বা শত্রুপক্ষের জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

Limpet mine explosion on a tanker in the Strait of Hormuz.

আরও পড়ুন: রবিবারের প্রতিবাদে রাহুলদের পাশে মমতা! কড়া নিরাপত্তা দিল্লিতে, নজরদারিতে ২০০ AI ক্যামেরা

এতদিন হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) এই ধরনের বিস্ফোরকের ব্যবহার নিয়ে তেমন কোনও খবর সামনে আসেনি বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। তাই সাম্প্রতিক ট্যাঙ্কার বিস্ফোরণের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। কারণ, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহণ করা হয়। এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে। তার উপর ভারতীয় নাবিকদের উপস্থিতি থাকায় বিষয়টি নয়াদিল্লির কাছেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তবে ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। হামলার ধরন এবং ব্যবহৃত বিস্ফোরক সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য সামনে না আসা পর্যন্ত কোনও পক্ষকে দায়ী করা যাচ্ছে না। আপাতত ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হরমুজের পরিস্থিতির উপর নজর রাখাই কেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য।