বাংলাহান্ট ডেস্ক: ২০২৯ সালের মধ্যে দেশকে মাদকমুক্ত (Drug Free India) করার লক্ষ্য নিয়েই এবার আরও বড় পরিসরে অভিযানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। গোয়ার রাজধানী পানাজিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে এই লক্ষ্যের কথা জানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। তাঁর কথায়, নকশালবাদ মোকাবিলায় যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হয়েছে, মাদক সমস্যার বিরুদ্ধেও একই রকম দৃঢ় ও দীর্ঘমেয়াদি লড়াই প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই জুলাই ২০২৬ থেকে জুলাই ২০২৯ পর্যন্ত তিন বছরের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। শুধু ছোটখাটো চালান আটক বা কয়েকজন পাচারকারীকে গ্রেফতার করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য নয়। বরং মাদক ব্যবসার পিছনে থাকা মূলচক্রী, অর্থদাতা, সরবরাহের গোটা চক্র এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা অভিযুক্তদের পর্যন্ত পৌঁছনোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মাদক মুক্ত ভারত (Drug Free India) গড়তে তৈরি অমিত শাহের রোডম্যাপ:
নতুন রোডম্যাপে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করেছে সরকার। আগামী তিন বছরে ১০০টি আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাজ্য মাদক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, মাদক সংক্রান্ত মামলায় বিদেশে পালিয়ে থাকা ১০০ জন অভিযুক্তকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ১০০টি গোপন মাদক তৈরির ল্যাবরেটরি নির্মূল করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে ৫০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছনোর পরিকল্পনা রয়েছে। তৈরি করা হবে এক লক্ষ ‘নেশামুক্ত বন্ধু’, যাঁরা সমাজে সচেতনতা তৈরির কাজে যুক্ত থাকবেন। সরকারের এই কৌশলে নিচ থেকে ওপর এবং ওপর থেকে নিচ—দুই দিক থেকেই তদন্ত চালানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কোনও ছোট চালান থেকে তদন্ত শুরু হলে সেটিকে ধাপে ধাপে মূলচক্রী ও অর্থদাতার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। আবার বড় কোনও নেটওয়ার্কের সন্ধান মিললে সেখান থেকে গোটা সরবরাহ ব্যবস্থার শিকড় খোঁজা হবে (Drug Free India)।
মাদকবিরোধী এই অভিযানের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের উপর। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানোর পাশাপাশি মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক ও অন্যান্য পূর্বসূরি উপাদানের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে নজর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মাদকের চাহিদা কমানো, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে বড় মাদক মামলায় টাকার গতিপথ খুঁজে বের করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ED, Financial Intelligence Unit এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সাহায্যে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেনের উৎস শনাক্ত করা হবে। অন্যদিকে BSF, CISF, Indian Coast Guard, Customs ও DRI-কে সীমান্ত, বন্দর, বিমানবন্দর এবং কার্গো এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হবে। বিদেশে পালিয়ে থাকা অভিযুক্তদের দেশে ফেরাতে CBI, বিদেশ মন্ত্রক এবং ইন্টারপোলের সঙ্গেও সমন্বয় করা হবে।
সরকারি পরিসংখ্যানেও গত কয়েক বছরে মাদকবিরোধী অভিযানের পরিধি বাড়ার ছবি তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রায় ২৬ লক্ষ কিলোগ্রাম মাদক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, যার আনুমানিক মূল্য ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকা। সেখানে ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ১ কোটি ১৯ লক্ষ কিলোগ্রামেরও বেশি মাদক উদ্ধার হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা বলে সরকারি তথ্য। অর্থাৎ পরিমাণের বিচারে আগের দশকের তুলনায় এই সময়ে জব্দের পরিমাণ প্রায় ৪.৬ গুণ বেড়েছে। সাম্প্রতিক ‘অপারেশন হোয়াইট স্ট্রাইক’-এর কথাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের মে মাসে NCB মুম্বই প্রায় ৩৪৯ কেজি উচ্চমানের কোকেন উদ্ধার করে, যার আনুমানিক মূল্য ১,৭৪৫ কোটি টাকা। কালাম্বোলি থেকে ১৩৬ কেজি উদ্ধারের পর তদন্তে ভিওয়ান্ডির একটি গুদামের হদিশ মেলে, সেখান থেকে আরও ২১৩ কেজি কোকেন পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের অনুমান, যন্ত্রপাতির ভিতরে লুকিয়ে এই মাদক দেশে আনা হয়েছিল।

তবে মাদকের (Drug Free India) বিরুদ্ধে সরকারের পরিকল্পনা শুধু ধরপাকড় বা পাচার বন্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সচেতনতা, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের দাবি, ‘নেশামুক্ত ভারত অভিযান’-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ২৫ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষ আসক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আগামী দিনে দেশে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে ১,৭৫১ করার পরিকল্পনা রয়েছে। NCC, NSS এবং ‘মাই ভারত’-এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও যুব সমাজকে এই উদ্যোগে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩৬টি দেশ থেকে ২৭৪ জন পলাতককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। যদিও এই সংখ্যা শুধু মাদক মামলার নয়, বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত পলাতকদের অন্তর্ভুক্ত করে। নতুন পরিকল্পনায় অবশ্য মাদক সংক্রান্ত মামলায় ১০০ জন পলাতককে ফিরিয়ে আনার নির্দিষ্ট লক্ষ্য রাখা হয়েছে। ফলে আগামী তিন বছর কেন্দ্রের নজর শুধু মাদক জব্দে নয়, বরং পাচারচক্রের অর্থ, নেটওয়ার্ক, মূলচক্রী এবং মাদকের চাহিদা—সব দিকেই থাকবে।













