বাংলা হান্ট ডেস্কঃ নয় বছর জেল খাটার পর অবশেষে মুক্তি। ধর্ষণ ও খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস দিল কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। তদন্তে একের পর এক গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে বলেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানায় ডিভিশন বেঞ্চ।
কী ঘটেছিল?
সূত্রের খবর, ২০০৮ সালের ৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার গোলাঘাট গ্রামে সাত বছরের এক নাবালিকা বাড়ির কাছে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। পরে কংসাবতী নদী থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। প্রথমে পরিবারের কারও সন্দেহ হয়নি।
কিন্তু অন্ত্যেষ্টির সময় এক আত্মীয় লক্ষ্য করেন, শিশুটির যৌনাঙ্গে কালশিটে ও রক্তের দাগ রয়েছে। তখন দেহ কবর দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। পরে পুলিশে অভিযোগ জানানো হলে দেহ কবর থেকে তুলে তমলুক হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রিপোর্টে জানান, নাবালিকার শরীরে সাতটি আঘাতের চিহ্ন ছিল। নাক ও মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল। যৌনাঙ্গেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। রিপোর্টে ধর্ষণের উল্লেখ ছিল এবং বলা হয়, জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে মেয়েটির বাবা শেখ আকাশ ও শেখ জাহাঙ্গীর নামে দু’জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে। পরে শেখ আকাশ জামিনে মুক্তি পেয়ে পলাতক হন। ২০১৭ সালের অগস্টে নিম্ন আদালত শেখ জাহাঙ্গীরকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর জেল থেকেই হাই কোর্টে (Calcutta High Court) আপিল করেন জাহাঙ্গীর।
হাই কোর্টের (Calcutta High Court) পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা ও বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তার ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটি খতিয়ে দেখে একাধিক গাফিলতির কথা উল্লেখ করেন। বিচারপতিরা বলেন, জাহাঙ্গীর যদি অপরাধ করতেন, তাহলে তিনি নিজেই নাবালিকার বাবা-মাকে জানাতেন না যে, বাজারে মেয়েটিকে খেলতে দেখেছেন। নিজেকে কোনও ভাবে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতেন না।
তাঁরা আরও জানান, জাহাঙ্গীর নাবালিকাকে শেষবার দেখেছিলেন বটে, কিন্তু তিনিই একমাত্র ব্যক্তি নন যিনি শেষবার দেখেছেন। বাবা-মা নিম্ন আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, জাহাঙ্গীর তাঁদের জানিয়েছিলেন, মেয়েটিকে নিখোঁজের আগের দিন বাজারে ঘোরাঘুরি করতে ও কাঁদতে দেখেছেন। তবে এমন কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই, যিনি বলেছেন যে জাহাঙ্গীর মেয়েটির সঙ্গে ছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে। বিচারপতিদের মতে, অভিযুক্তের সিমেন বা বীর্যের নমুনার সঙ্গে নাবালিকার শরীরের রক্ত বা অন্য কোনও নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি ফরেনসিক ল্যাবরেটরির পরীক্ষার রিপোর্টও নিম্ন আদালতে পেশ করা হয়নি। নিম্ন আদালতে শুধু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দাখিল হয়েছিল। অন্য কোনও মেডিক্যাল রিপোর্ট পেশ করা হয়নি।

আরও পড়ুনঃ CCTV-প্রহরী রাখার নির্দেশ কেন? শিবরাত্রিতে পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুললেন শুভেন্দু
বিচারের সময়ে অভিযুক্তের আইনজীবী দাবি করেন, নাবালিকার জামাকাপড় উদ্ধার হয়েছিল শেখ আকাশের বাড়ি থেকে, জাহাঙ্গীরের বাড়ি থেকে নয়। সবশেষে, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ধর্ষণের উল্লেখ থাকলেও, সেই ধর্ষণ জাহাঙ্গীরই করেছেন এমন কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই বলে জানায় হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। তদন্তে গুরুতর ফাঁক ও প্রমাণের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে ডিভিশন বেঞ্চ শেখ জাহাঙ্গীরকে বেকসুর খালাস দেয়। প্রায় নয় বছর জেল খাটার পর মুক্তি পান তিনি।












