বাংলাহান্ট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির আবহের মধ্যেই আবারও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগের সঞ্চার করল ইরান (Iran)। হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির কাছ থেকে বিশেষ ‘ফি’ নেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছেন চিনে (China) নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদোলরেজা রহমানি ফাজলি। তাঁর এই মন্তব্য সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, সম্প্রতি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হবে না বলেই জানানো হয়েছিল। কিন্তু নতুন এই ঘোষণায় সেই অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও ঠিক কবে থেকে এই নতুন ফি কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি তেহরান।
ট্রাম্পকে পরোয়া না করেই হরমুজে (Strait of Hormuz) ‘টোল’-এর সিদ্ধান্ত ইরানের!
শনিবার বেজিংয়ে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফাজলি বলেন, হরমুজ প্রণালী ইরানের কৌশলগত ও ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। তাই এই অঞ্চলে আরও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং জাহাজ চলাচল আরও সুশৃঙ্খল করতে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ওমানের সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করছে ইরান। রাষ্ট্রদূতের কথায়, হরমুজ যেহেতু ইরানের রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্ভুক্ত, তাই সেখানে চলাচলকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফি নেওয়ার অধিকার তেহরানের রয়েছে। পাশাপাশি তিনি জানান, এই অর্থ ব্যবহার করা হবে জলপথের নিরাপত্তা জোরদার করা, জাহাজগুলির ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং অতিরিক্ত নৌ-চলাচলের ফলে পরিবেশের উপর যে প্রভাব পড়ছে, তার মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য।
আরও পড়ুন: গ্লোবাল পাসপোর্ট ইনডেক্স-এ পিছোল ভারত! তালিকায় কোথায় রয়েছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান?
তবে এই ঘোষণার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কারণ, যুদ্ধবিরতির পর ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, সেখানে আগামী ৬০ দিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে কোনও ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায় না করার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। সেই পরিস্থিতিতে ইরানের নতুন অবস্থান ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালীতে কোনও ধরনের টোল বা অতিরিক্ত ফি আরোপের বিরোধিতা করে আসছে আমেরিকা। অতীতে এই ইস্যুতে ইরানকে একাধিকবার সতর্কও করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে নতুন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা নিয়েও কূটনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে।
ফাজলি অবশ্য একই সঙ্গে জানিয়েছেন, সব দেশের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, যেসব দেশ অতীতে ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং কঠিন সময়ে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা বা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে কোন কোন দেশকে ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ হিসেবে ধরা হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনও নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করেননি। এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নামও আলোচনায় উঠে এসেছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও ইরানের মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাবাহার বন্দর-সহ একাধিক প্রকল্পে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ভারতীয় জাহাজগুলিকে এই ফি থেকে ছাড় দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: নাতির শোকে মর্মান্তিক পরিণতি! কেতনের মৃত্যুর ১৬ দিন পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত ঠাকুরদা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ফলে এই জলপথে যেকোনও নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পরিবহণ ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে। ইরানের সাম্প্রতিক ঘোষণা আপাতত একটি নীতিগত অবস্থান হলেও, এটি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে এবং আমেরিকা-সহ অন্যান্য দেশ কী প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ওপরই ভবিষ্যতের পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে। একই সঙ্গে ভারত-সহ ইরানের ঘনিষ্ঠ দেশগুলি এই নতুন ব্যবস্থায় কোনও বিশেষ সুবিধা পায় কি না, সেটিও আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।













