বাংলাহান্ট ডেস্ক: নেপাল ও ভারতের (India-Nepal) মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিতর্কের আবহে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিলেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তিন দিনের ভারত সফরে এসে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কাঠমান্ডু সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্ত মতপার্থক্য আলোচনা ও কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান করতে চায়। রবিবার নয়াদিল্লিতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে খানাল বলেন, দুই দেশ যদি খোলা মনে আলোচনার টেবিলে বসে, তাহলে এমন কোনও সমস্যা নেই যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, নেপালের বর্তমান সরকার ভারতকে পুরনো ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না। বরং উন্নয়ন, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতেই আগ্রহী কাঠমান্ডু।
ভারত-নেপাল (India-Nepal) সীমান্ত নিয়ে আলোচনায় দুই দেশের বিদেশমন্ত্রী:
শুক্রবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছনোর পর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের (India-Nepal) বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হল যখন বিতর্কিত লিপুলেখ গিরিপথ ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ লিপুলেখ নিয়ে চিন ও ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ভারত যেমন নেপালের কিছু ভূখণ্ড দখল করেছে, তেমনই নেপালও ভারতের কিছু এলাকা দখল করে রেখেছে। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এর জবাবে ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, ভারত-নেপাল সম্পর্কের মতো দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে কোনও তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। এই আবহেই খানালের সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: টাকা তুলতে গিয়ে বারংবার হতাশ গ্রাহকরা! দেশজুড়ে কেন কমছে ATM-এর সংখ্যা?
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খানাল ভারত-নেপাল সম্পর্ককে শুধুমাত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, “আমরা শুধু মানচিত্রের প্রতিবেশী নই, আমরা একই নদীর সন্তান।” তাঁর মতে, দুই দেশের সম্পর্ক শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, সামাজিক এবং মানবিক বন্ধনের উপর প্রতিষ্ঠিত। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পারিবারিক যোগাযোগের যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ায় বিরল। এই ঐতিহাসিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতেই বর্তমান নেপালি সরকার কাজ করতে চায় বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে ভারতকে বিশ্বের দ্রুততম বিকাশমান অর্থনীতিগুলির অন্যতম এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন খানাল।
জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুই দেশই চায় উন্মুক্ত সীমান্ত যেন উন্নয়ন ও সংযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ডিজিটাল সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি। নেপালের এনসিএইচএল এবং ভারতের এনপিসিআই-এর মধ্যে চুক্তির ফলে আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর কাজ এগোচ্ছে। এর ফলে দুই দেশের সাধারণ মানুষ ইউপিআই-সদৃশ সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন, যা বাণিজ্য, পর্যটন এবং দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনকে আরও সহজ ও দ্রুত করবে।

ভারতের (India-Nepal) সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করে খানাল জানান, ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভারতের সহায়তায় নেপালে নির্মিত ৭২টি স্বাস্থ্য প্রকল্প এবং ১২টি সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন প্রকল্প ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে নেপালের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত গবেষণার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের ডিজিটাল ইন্ডিয়া মিশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সব মিলিয়ে সীমান্ত বিতর্কের আবহ থাকা সত্ত্বেও ভারত-নেপাল সম্পর্ককে সংঘাতের পরিবর্তে উন্নয়ন, সংযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তাই দিলেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।













