বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতীয় সেনার অগ্নিশক্তি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ঝুলিতে যুক্ত হল এক নতুন সাফল্য। দেশীয় সংস্থা নাইব লিমিটেড তৈরি করেছে অত্যাধুনিক ১২০ মিমি ভেহিকল-মাউন্টেড মর্টার সিস্টেম ‘গরুড়াস্ত্র’ (Garudastra)। সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের মাউ শহরে অবস্থিত ইনফ্যান্ট্রি স্কুলে এই অস্ত্রব্যবস্থার সফল প্রদর্শন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সেনার আধুনিকীকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গরুড়াস্ত্রকে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত গতিতে বদলে যাওয়া যুদ্ধের কৌশল এবং প্রযুক্তিনির্ভর লড়াইয়ের যুগে এই ধরনের অস্ত্র ভারতীয় সেনার সক্ষমতাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ভারতীয় সেনার শক্তি বাড়াবে ‘গরুড়াস্ত্র’ (Garudastra), অবাক করবে ক্ষমতা
গরুড়াস্ত্র মূলত একটি দীর্ঘ-পাল্লার ১২০ মিমি মর্টার, যা একটি হালকা ৪x৪ সামরিক যানবাহনের উপর স্থাপন করা হয়েছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ‘শুট অ্যান্ড স্কুট’ প্রযুক্তি। অর্থাৎ, অস্ত্রটি খুব দ্রুত নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গোলাবর্ষণ করতে পারে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অবস্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র সরে যেতে সক্ষম। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে যেখানে ড্রোন, স্যাটেলাইট এবং রাডারের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা হয়, সেখানে একই জায়গায় দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গরুড়াস্ত্রের এই দ্রুত অবস্থান বদলের ক্ষমতা শত্রুপক্ষের পাল্টা হামলার সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
এই মর্টার ব্যবস্থার আরেকটি অত্যাধুনিক বৈশিষ্ট্য হল ‘মাল্টিপল রাউন্ডস সিমালটেনিয়াস ইমপ্যাক্ট’ বা এমআরএসআই প্রযুক্তি। এই ব্যবস্থায় একই মর্টার থেকে বিভিন্ন কোণ ও গতিতে একাধিক গোলা ছোড়া হয়, যা একই সময়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ফলে শত্রুপক্ষের প্রতিরোধ বা আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না। প্রতিরক্ষা মহলের মতে, এই প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক প্রভাব তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল বা দ্রুত আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের পরিস্থিতিতে এই ধরনের অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ক্ষমতার দিক থেকেও গরুড়াস্ত্র যথেষ্ট শক্তিশালী। এটি ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে ব্যবহৃত ১৭ কেজি ওজনের শক্তিশালী ওয়ারহেড প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পুরু রিইনফোর্সড কংক্রিট ভেদ করতে পারে। ফলে বাঙ্কার, সুরক্ষিত ঘাঁটি বা শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামোর বিরুদ্ধেও এটি কার্যকর। জানা গিয়েছে, গরুড়াস্ত্র প্রতি মিনিটে ১২ থেকে ১৬ রাউন্ড পর্যন্ত গোলাবর্ষণ করতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে প্রতি মিনিটে ৩ থেকে ৪ রাউন্ড ফায়ার করার ক্ষমতাও রয়েছে। সেনার জন্য দ্রুত এবং ধারাবাহিক আগ্নেয় সমর্থন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে গরুড়াস্ত্রের (Garudastra) সবচেয়ে আধুনিক দিক হল এর ড্রোন ও নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সক্ষমতা। এটি ড্রোন, রাডার এবং কমান্ড নেটওয়ার্ক থেকে সরাসরি তথ্য গ্রহণ করতে পারে। ফলে কোনও ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান চিহ্নিত করলেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে গরুড়াস্ত্র সেই লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলা চালাতে পারে। এছাড়া এতে জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত এবং লেজার-গাইডেড গোলাবারুদ ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে, যা প্রচলিত মর্টারের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলতা নিশ্চিত করে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, গরুড়াস্ত্র শুধু একটি নতুন অস্ত্র নয়, বরং ভারতীয় সেনার জন্য আধুনিক, গতিশীল এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষমতার এক নতুন অধ্যায়। একইসঙ্গে এটি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচির সাফল্যেরও উজ্জ্বল উদাহরণ।

















