বাংলাহান্ট ডেস্ক: ২০০৮ সালের ২৬ জুলাই। সাধারণ দিনের মতোই ব্যস্ত ছিল গুজরাটের (Gujarat High Court) আহমেদাবাদ (Ahmedabad) শহর। কিন্তু মাত্র ৭০ মিনিটের মধ্যে শহরের ২১টি ভিন্ন স্থানে একের পর এক বিস্ফোরণে (Ahmedabad Serial Blasts) বদলে যায় গোটা পরিস্থিতি। আতঙ্ক, রক্তাক্ত রাস্তা এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষের আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল শহর। সেই ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান ৫৬ জন এবং আহত হন ২০০-রও বেশি মানুষ। দীর্ঘ তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইনি লড়াইয়ের পর এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল গুজরাট হাই কোর্ট। বিশেষ আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দোষীদের করা সমস্ত আপিল মঙ্গলবার খারিজ করে আদালত ৪৯ জন দোষীর সাজা বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে ৩৮ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকল।
আমেদাবাদ বিস্ফোরণকাণ্ডে বড় রায় দিল গুজরাট হাই কোর্ট (Gujarat High Court):
তদন্তে উঠে আসে, এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণের নেপথ্যে ছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ২০০২ সালের গোধরা অগ্নিকাণ্ডের পর গুজরাটে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, তার প্রতিশোধ নিতেই এই হামলার ছক কষা হয়। বিস্ফোরণের জন্য শহরের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় আগে থেকেই বোমা পেতে রাখা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সর্বাধিক প্রাণহানি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করাই ছিল জঙ্গিদের উদ্দেশ্য। ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে একাধিক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ তদন্তের পর আদালতে বিশদ চার্জশিট পেশ করা হয় (Gujarat High Court)।
আরও পড়ুন: মেট্রোয় অসভ্যতা আর নয়! গালাগাল করলেই ফাইন, একাধিক অপরাধে গুনতে হবে মোটা জরিমানা
২০২২ সালে বিশেষ আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করে। মোট ৭৭ জন অভিযুক্তের মধ্যে ২৮ জনকে প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। বাকি ৪৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, দেশের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে যারা পরিকল্পিত জঙ্গি হামলা চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তিই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে আদালত ব্যাখ্যা করে জানায়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১১ জন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বিস্ফোরণের মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁদের ভূমিকা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য পর্যায়ের নয়। সেই কারণেই তাঁদের ক্ষেত্রে পৃথক শাস্তি নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষ আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে গুজরাট হাই কোর্টে আপিল করেন দোষীরা। দীর্ঘ শুনানির পর মঙ্গলবার হাই কোর্ট জানিয়ে দেয়, বিশেষ আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনও নতুন বা গ্রহণযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায়নি। ফলে ৪৯ জনের বিরুদ্ধে ঘোষিত সাজাই বহাল রাখা হয়েছে। আদালতের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি বহুল আলোচিত সন্ত্রাসবাদ মামলার গুরুত্বপূর্ণ আইনি অধ্যায় শেষ হল বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এটি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশের বিচারব্যবস্থার কঠোর অবস্থানকেও আরও একবার স্পষ্ট করেছে।

আহমেদাবাদ ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার পর এই মামলায় হাই কোর্টের (Gujarat High Court) রায় বহু নিহত ও আহত পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে দোষীদের সামনে এখনও সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে, তবুও গুজরাট হাই কোর্টের এই রায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, সংগঠিত সন্ত্রাসবাদ এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানির মতো অপরাধের ক্ষেত্রে আইন কোনও রকম শিথিলতা দেখাবে না এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানই বজায় থাকবে।












