বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছুঁল প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)। দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘রুদ্রম-২’ (Rudram-II)-এর সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার ওড়িশার চাঁদিপুর উপকূলে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি যুদ্ধবিমান থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। ডিআরডিও জানিয়েছে, পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ সফল হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশের অবস্থানকে আরও মজবুত করবে।
দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘রুদ্রম-২’ (Rudram-II)-এর সফল পরীক্ষা সম্পন্ন:
ডিআরডিও সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘রুদ্রম-২’ (Rudram II) একটি সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা শব্দের গতির প্রায় তিন গুণ বেগে উড়তে সক্ষম। সামরিক পরিভাষায় এই গতিবেগকে ‘ম্যাক-৩’ বলা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল শত্রুপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স নেটওয়ার্ককে অচল করে দেওয়া। এটি শত্রুর রাডার, ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ধ্বংস করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার জন্য এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যেখানে রাডার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা অনেক বেশি, সেখানে ‘রুদ্রম-২’ একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সীমান্ত বিরোধে চিন-ব্রিটেনকে জড়াতে চায় নেপাল! হুঁশিয়ারি দিয়ে কী জানাল দিল্লি?
এই ক্ষেপণাস্ত্র ভারতীয় বায়ুসেনার সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২০ সালে একই সুখোই যুদ্ধবিমান থেকে ‘রুদ্রম’ সিরিজের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ‘রুদ্রম-১’-এর সফল পরীক্ষা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আরও উন্নত প্রযুক্তি ও অধিক ক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘রুদ্রম-২’ (Rudram II)। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এজিএম-৮৮ই অ্যান্টি রেডিয়েশন গাইডেড মিসাইল’-এর সমতুল্য। ক্ষেপণাস্ত্রটিতে উন্নতমানের ‘আইএনএস-জিপিএস নেভিগেশন’ ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক ‘হোমিং হেড’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা শত্রুপক্ষের বিকিরণ বা রশ্মি নির্গতকারী উৎসকে দ্রুত শনাক্ত করে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
RudraM-II, Air-to-Surface Missile was successfully tested by #DRDO and @IAF_MCC from Airborne Platform. The tests were conducted under extreme release conditions with critical trajectory establishing the capability of all subsystems. pic.twitter.com/ED6DZK4hz7
— DRDO (@DRDO_India) June 2, 2026
ডিআরডিও জানিয়েছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে তাদের একাধিক গবেষণাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ল্যাবরেটরি, হাই এনার্জি ম্যাটেরিয়ালস রিসার্চ ল্যাবরেটরি, আর্মামেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট এবং ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রেঞ্জ (আইটিআর)-সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই প্রকল্পে কাজ করেছে। দীর্ঘ গবেষণা, পরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে কার্যকর রূপ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই প্রকল্প ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
শুধু সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের বিভিন্ন শিল্প সংস্থাও এই প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ‘ডেভেলপমেন্ট কাম প্রোডাকশন পার্টনারস’ হিসেবে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (হ্যাল), রিজিওনাল সেন্টার ফর মিলিটারি এয়ারওয়ার্দিনেস, মিসাইল সিস্টেম কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স এজেন্সি এবং আরও বহু বেসরকারি ও সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছে। ডিআরডিওর মতে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পক্ষেত্রের এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই প্রকল্পটিকে সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এর ফলে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রেও আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য আরও একধাপ এগিয়ে গেল।

রুদ্রম-২ (Rudram II)-এর সফল পরীক্ষাকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। তিনি সমাজমাধ্যমে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, এই সাফল্য দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উৎকর্ষের প্রতীক। তাঁর মতে, উন্নত সমরাস্ত্র নির্মাণে আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলার পথে এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদেরও মত, ‘রুদ্রম-২’ শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং এটি ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গবেষণা দক্ষতা এবং কৌশলগত আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন দেশের সামরিক শক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।













