মহাকাশ গবেষণায় আরও এক বড় সাফল্য ভারতের। দেশের নিজস্ব উপগ্রহ-ভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা ‘নাভিক’ (NavIC)-কে আরও শক্তিশালী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO)। নতুন উপগ্রহ NVS-03 সফলভাবে নির্ধারিত জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে পৌঁছে গিয়েছে। এর ফলে ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থাকে ফের কার্যকর করে তোলার পথে বড় অগ্রগতি হল বলে মনে করা হচ্ছে। এত দিন অবস্থান নির্ণয় ও দিকনির্দেশের ক্ষেত্রে আমেরিকার GPS-সহ বিদেশি ব্যবস্থার উপর ভারতের যে নির্ভরতা ছিল, তা কমানোর ক্ষেত্রে এই সাফল্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নাভিক সম্পূর্ণ পরিষেবা দিতে শুরু করলে তা GPS-কে সরাসরি প্রতিস্থাপন করবে না, বরং ভারতের নিজস্ব একটি বিকল্প ও পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।
NVS-03 কক্ষপথে পৌঁছতেই পূর্ণ শক্তিতে সচল দেশের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা NavIC:
গত ৩০ অক্টোবর শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে GSLV-F18 রকেটে চেপে মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে NVS-03। উৎক্ষেপণের পর প্রথমে উপগ্রহটিকে একটি অন্তর্বর্তী কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছিল। সেখান থেকে ধাপে ধাপে তিনটি অরবিট-রেইজিং ম্যানুভার বা কক্ষপথ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। সম্প্রতি তৃতীয় তথা শেষ ধাপটিও সফলভাবে শেষ করেছে ইসরো। এর পর উপগ্রহটি ৩৫,৮৪২.৬ x ৩৪,৫৯৪.৯ কিলোমিটারের নির্ধারিত জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে পৌঁছে যায়। এই সাফল্য শুধু একটি উপগ্রহকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের নিজস্ব নেভিগেশন পরিকাঠামোকে মজবুত করার ক্ষেত্রেও তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ (NavIC)।
২৫০ টাকার স্মারক মুদ্রা প্রকাশ অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের! কীভাবে করবেন সংগ্রহ?
নাভিকের পুরো নাম ‘নেভিগেশন উইথ ইন্ডিয়ান কনস্টেলেশন’। সহজ কথায়, এটি ভারতের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা। দেশের মূল ভূখণ্ডের পাশাপাশি সীমান্তের বাইরে প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় অবস্থান নির্ণয় এবং নির্ভুল সময়ের তথ্য দিতে পারে এই প্রযুক্তি। দৈনন্দিন জীবনেও এর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্টফোন, গাড়ি, ট্রেন, বিমান, জাহাজ কিংবা বিভিন্ন ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় নাভিকের সিগন্যাল কাজে লাগানো সম্ভব। পাশাপাশি দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ, মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা, সামুদ্রিক পরিবহণ এবং সামরিক কার্যকলাপেও এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ফলে একটি শক্তিশালী দেশীয় নেভিগেশন নেটওয়ার্ক থাকা ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
তবে নাভিকের পথটা সব সময় মসৃণ ছিল না। এর আগে কয়েকটি পুরনো উপগ্রহে থাকা অ্যাটমিক ক্লক বা পারমাণবিক ঘড়িতে প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এই ঘড়ি অত্যন্ত নির্ভুল সময়ের সংকেত পাঠানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্য দিকে, NVS-02 উপগ্রহটি প্রপালশন ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছতে পারেনি। ফলে নাভিকের কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সক্রিয় উপগ্রহের অভাব তৈরি হয়েছিল। NVS-03-এর সফল কক্ষপথে অবস্থান সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ। নতুন উপগ্রহটিতে রয়েছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত অ্যাটমিক ক্লক। পাশাপাশি L1 ফ্রিকুয়েন্সি ব্যান্ড সমর্থন থাকায় সাধারণ স্মার্টফোন ও নেভিগেশন রিসিভারের সঙ্গে এর সংযোগ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপগ্রহটির কার্যক্ষমতার মেয়াদ অন্তত ১২ বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ৪ হাজার কোটি বরাদ্দেও স্বস্তি নেই! ডিএ নিয়ে ফের আন্দোলনের প্রস্তুতি সরকারি কর্মীদের
বিদেশি নেভিগেশন ব্যবস্থার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের প্রযুক্তির উপর ভরসা বাড়ানোই নাভিক প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সংঘাত কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে বিদেশি স্যাটেলাইট পরিষেবায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে নিজস্ব ব্যবস্থা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পরিবহণ থেকে শুরু করে পরিকাঠামো নির্মাণ, সামরিক পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে NVS-03 কক্ষপথে পৌঁছেছে মানেই সমস্ত পরিষেবা ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের জন্য চালু হয়ে গিয়েছে, এমনটা নয়। ইসরোর তরফে উপগ্রহটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা পরীক্ষা করে কমিশনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। সেই পর্ব শেষ হওয়ার পরই পূর্ণাঙ্গ পরিষেবা চালুর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। সব মিলিয়ে, NVS-03-এর সাফল্য ভারতের মহাকাশ গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক (NavIC।












