বাংলা হান্ট ডেস্ক : বিধানসভার সই জালিয়াতি মামলার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। এই ঘটনায় রবিবার তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) এবং দলের এক বিধায়ক কুণাল ঘোষকে (Kunal Ghosh) দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। প্রায় আট ঘণ্টার ম্যারাথন জেরার পর দুই নেতাকে মুখোমুখি বসিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য অমিল ধরা পড়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিষেক (Abhishek Banerjee)কুণালের বক্তব্যে অমিল
তদন্ত সূত্রে জানা গিয়েছে, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠককে কেন্দ্র করেই মূলত প্রশ্ন করা হয়। ওই বৈঠকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টি স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন তদন্তকারীরা। সিআইডির দাবি অনুযায়ী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জেরার সময় জানান যে সংশ্লিষ্ট বৈঠকে একটি রেজলিউশন গৃহীত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, তবে কুণাল ঘোষের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি তদন্তকারীদের বলেন, সেই বৈঠকে কোনও ধরনের রেজলিউশন পাশ করা হয়নি। একই ঘটনার বিষয়ে দুই নেতার এই ভিন্ন অবস্থান তদন্তকারীদের নজর কেড়েছে বলে সূত্রের খবর। প্রসঙ্গত, ঘটনার শিকড় রয়েছে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর স্পিকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
এর পরেই বিধানসভার তরফে বৈঠকের সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত নথি এবং বিধায়কদের স্বাক্ষর-সহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ মেনেই ৭০ জন বিধায়কের স্বাক্ষরযুক্ত একটি নথি বিধানসভায় জমা পড়ে। কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে, সেখানে থাকা একাধিক স্বাক্ষর প্রকৃত নয় এবং তা জাল করা হয়েছে। অভিযোগ সামনে আসার পরই তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডি।
তদন্তের অংশ হিসেবে রেজলিউশন বুকের খোঁজে ইতিমধ্যেই একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে গোয়েন্দারা। সূত্রের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কাছে অবস্থিত তৃণমূলের পার্টি অফিস থেকে শুরু করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের কার্যালয়— বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধান করা হলেও এখনও পর্যন্ত সেই গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
জেরায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, নথিটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে সে বিষয়ে তাঁর নির্দিষ্ট ধারণা নেই। তাঁর মতে, অফিসের কর্মীরাই এ বিষয়ে বেশি তথ্য দিতে পারবেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অ্যানেক্সচার-সহ নথিটি তাঁর কাছে শুধুমাত্র স্বাক্ষরের জন্য আনা হয়েছিল। অন্যদিকে কুণাল ঘোষের বক্তব্য, একজন বিধায়ক হিসেবে ওই নথির সংরক্ষণ বা অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ রাখা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। শুধু তাই নয়, নথিতে কারা সই করেছিলেন এবং কোন সময়ে সেই স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেই বিষয়েও দুই নেতার বক্তব্যে ফারাক পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি সিআইডির।
যদিও জেরার পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কুণাল ঘোষ বলেন, “তিনি তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন এবং কোনও দোষ বা বিতর্কিত কাজ করেননি।” মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া চলায় এর বেশি কিছু বলতে চাননি। তদন্তের পরবর্তী ধাপে সোমবার বিধানসভায় যায় সিআইডির একটি বিশেষ দল। সেখানে প্রধান সচিবের দফতর থেকে বিভিন্ন নথি, রেকর্ড এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও ক্রমশ বাড়ছে।

বিরোধীরা ইতিমধ্যেই বিষয়টিকে হাতিয়ার করে শাসকদলকে আক্রমণ শুরু করেছে। ফলে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও এই মামলার অগ্রগতি নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন দেখার, সংগ্রহ করা নথি ও জেরায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে CID পরবর্তী পর্যায়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং সই জালিয়াতির অভিযোগের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত সত্য কতটা সামনে আসে।

















