বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতে (India) প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) ফের ঊর্ধ্বমুখী। দীর্ঘ সময়ের ওঠানামার পর ২০২৫ সালে বিদেশি সংস্থাগুলির বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা UNCTAD-এর সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে মোট ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। ২০২৪ সালে এই অঙ্ক ছিল ২৭.১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪৩.৬ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে যেখানে FDI বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৬ শতাংশ, সেখানে ভারতের এই সাফল্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বৃদ্ধির সুবাদে বিশ্বে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের তালিকায় ভারতের অবস্থানও আরও শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে মোট FDI প্রবাহের নিরিখে ভারত বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে এবং আগের তুলনায় আরও উপরে উঠে এসেছে।
এক বছরে ভারতে (India) বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ল ৪৪ শতাংশ:
UNCTAD-এর পরিসংখ্যান বলছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনও বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে আমেরিকা, যেখানে ২০২৫ সালে এসেছে ২৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর, তারপর যথাক্রমে হংকং, চিন, ব্রাজিল, ব্রিটেন, জার্মানি, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও মেক্সিকো। ৩৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের অবস্থানও এখন এই শীর্ষ দেশগুলির তালিকায়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন, প্রযুক্তি, ডিজিটাল পরিষেবা, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং পরিকাঠামো খাতে ভারতের (India) সম্ভাবনা বিদেশি সংস্থাগুলিকে নতুন করে আকৃষ্ট করছে। বিশ্বের বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ভারতকে একটি স্থিতিশীল এবং দ্রুত বিকাশমান বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে।
আরও পড়ুন: গ্রান্ট-ইন-এইডদের বকেয়া DA, DR নিয়ে বড় পদক্ষেপ! সরকারের কাছে গেল চিঠি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্যের পিছনে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক নীতিগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গত কয়েক বছরে ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ উন্নত করার লক্ষ্যে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা, কর কাঠামোয় পরিবর্তন এবং বহু ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন, প্রতিরক্ষা, টেলিযোগাযোগ, বীমা, অবকাঠামো এবং বিভিন্ন পরিষেবা খাতে বিদেশি সংস্থাগুলির বিনিয়োগের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে জমি, বিদ্যুৎ, লজিস্টিক এবং শিল্প নীতিতেও একাধিক সংস্কার করেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব বিনিয়োগের পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে এই ইতিবাচক ছবির পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও উঠে এসেছে। ২০২০ সালে ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬৪.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরপর কয়েক বছর ধরে সেই অঙ্ক ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪ সালে ২৭.১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২৫ সালে বৃদ্ধি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উত্থানের বড় অংশ এসেছে অন্ধ্রপ্রদেশে অ্যালফাবেট এবং হিনফ্রার মতো কয়েকটি বৃহৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের কারণে। অর্থাৎ, বিনিয়োগের এই প্রবৃদ্ধি এখনও দেশের সব রাজ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে আরও বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মত অর্থনীতিবিদদের।

আরও পড়ুন: শিশুর মোবাইল-আসক্তি ধরতে বাড়ি বাড়ি যাবেন আশাকর্মীরা, বড় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও ভারতীয় সংস্থাগুলির বিদেশমুখী বিনিয়োগও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে যেখানে ভারতীয় কোম্পানিগুলির বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২৪.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫.৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে একদিকে বিদেশি পুঁজি ভারতে (India) আসছে, অন্যদিকে দেশীয় সংস্থাগুলিও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুই প্রবণতা ভারতের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক গুরুত্বের ইঙ্গিত দিলেও, ভবিষ্যতে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

















