বাংলাহান্ট ডেস্ক একসময় তাঁদের জীবন কেটেছে জঙ্গলের অন্ধকারে, হাতে ছিল অস্ত্র, আর চারপাশে ছিল আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। লোকালয় থেকে বহু দূরে ছত্তিশগড়ের (Chhattisgarh) বস্তারের (Bastar) দুর্গম জঙ্গলে মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দিন কাটিয়েছেন বেশ কয়েকজন মহিলা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁদের জীবন। অস্ত্রের পথ ছেড়ে সমাজের মূলস্রোতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এবার তাঁদের দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য ভূমিকায়। হাতে বন্দুক নয়, গায়ে হ্যান্ডলুমের শাড়ি পরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে র্যাম্পে হাঁটলেন একসময় মাওবাদী (Maoists) আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা মহিলারা। ছত্তিশগড়ের রায়পুরে আয়োজিত একটি ফ্যাশন শোয়ের সেই দৃশ্য এখন নেটমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
র্যাম্পে হাঁটলেন ছত্তিশগড়ের (Chattisgarh) প্রাক্তন মাওবাদীরা, নেটদুনিয়ায় ভাইরাল ভিডিও
গত ৭ আগস্ট জাতীয় হ্যান্ডলুম দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ভারতীয় তাঁত ও হস্তশিল্পকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাককে আধুনিকভাবে তুলে ধরাই ছিল এই ধরনের অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য। রায়পুরের অনুষ্ঠানটিও সেই উদ্যোগের অংশ। দেশীয় তাঁতের পোশাককে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে আয়োজিত ফ্যাশন শোয়ে অংশ নেন আত্মসমর্পণ করা প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীরা। তাঁদের পরনে ছিল হ্যান্ডলুম শাড়ি। মঞ্চে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি দেখে দর্শকদের মধ্যেও তৈরি হয় বিশেষ আগ্রহ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও হ্যান্ডলুম দিবস উপলক্ষে দেশীয় তাঁতের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছিলেন (Chhattisgarh)।
আরও পড়ুন: শক্তি বাড়াচ্ছে নিম্নচাপ, বাড়ছে বৃষ্টি! কতদিন থাকবে দুর্যোগের পরিস্থিতি? ওয়েদার আপডেট
জানা গিয়েছে, এই মহিলাদের অনেকেরই অতীত জড়িয়ে ছিল বস্তারের মাওবাদী অধ্যায়ের সঙ্গে। একসময় দুর্গম জঙ্গলে থেকেই সংগঠনের কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন তাঁরা। অস্ত্র হাতে নিয়ে যে জীবন শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে সেই পথ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। আত্মসমর্পণের পর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা শুরু হয়। সেই যাত্রা মোটেই সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ ও জীবনধারা ছেড়ে সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নতুন করে মানিয়ে নেওয়া ছিল তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতীকী ছবি উঠে এল রায়পুরের ফ্যাশন শোয়ে।
বস্তারের নাম একসময় মাওবাদী হিংসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ছত্তিশগড়ের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে দীর্ঘদিন দেশের মাওবাদী আন্দোলনের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দেখা হয়েছে। সংঘর্ষ, হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের খবর প্রায় নিয়মিতই শিরোনামে আসত। তবে গত কয়েক বছরে পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের দাবি করেছে প্রশাসন। মাওবাদীদের আত্মসমর্পণে উৎসাহিত করা, তাঁদের পুনর্বাসন এবং সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার মতো একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও বস্তারে গিয়ে মাওবাদী হিংসার অবসানের লক্ষ্যের কথা একাধিকবার জানিয়েছেন। সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই প্রাক্তন মাওবাদীদের নতুন জীবন সামনে এসেছে।

ফলে রায়পুরের র্যাম্পে তাঁদের হাঁটা শুধু একটি ফ্যাশন শোয়ের অংশ হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। বরং এটিকে অতীতের হিংসাত্মক জীবন থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যে মহিলারা একসময় জঙ্গলের মধ্যে অনিশ্চিত জীবন কাটিয়েছেন, তাঁরাই এখন জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেদের নতুন পরিচয় তুলে ধরছেন। হ্যান্ডলুম শাড়িতে তাঁদের র্যাম্প ওয়াকের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই নেটমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বহু মানুষ তাঁদের এই পরিবর্তনের প্রশংসা করেছেন। অস্ত্র ছেড়ে শিক্ষা, কাজ, সংস্কৃতি ও স্বাভাবিক জীবনের পথে ফিরে আসার এই যাত্রা যে কতটা কঠিন, সেই বাস্তবতাই যেন আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল রায়পুরের এই ব্যতিক্রমী ফ্যাশন শো (Chhattisgarh)।













