বাংলাহান্ট ডেস্ক: চিনের (China) নতুন সামরিক পদক্ষেপকে ঘিরে আবারও বাড়ছে কৌশলগত উত্তেজনা। মায়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ইউনান প্রদেশে প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার পাল্লার একটি অত্যাধুনিক লং-রেঞ্জ লার্জ ফেসড অ্যারে রাডার (LPAR) মোতায়েন করেছে বেজিং বলে প্রতিরক্ষা মহলের একাংশের দাবি। যদিও এই রাডার স্থাপনের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত চিন বা ভারতের পক্ষ থেকে কোনও সরকারি ঘোষণা করা হয়নি, তবুও স্যাটেলাইট ছবি এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাডারের অবস্থান এমন জায়গায়, যেখান থেকে ভারতের (India) পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশের উপর নজরদারি চালানো সম্ভব হতে পারে। ফলে ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশল এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ভারতের মিসাইল পরীক্ষায় নজরদারি চালাতে মায়ানমার সীমান্তে রাডার বসাল চিন (China):
গত কয়েক বছরে চিন (China) ধারাবাহিকভাবে নিজেদের নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ পরিকাঠামো শক্তিশালী করার দিকে জোর দিয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ইউনানে এই নতুন LPAR মোতায়েন করা হয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। এই ধরনের রাডার শুধু দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতেই সক্ষম নয়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর তার গতিপথ, গতি, উচ্চতা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্যও বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে কোনও দেশের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্য ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি এবং প্রতিপক্ষের সক্ষমতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আরও পড়ুন: ফুটপাতে হকার উচ্ছেদ নিয়ে বড় ঘোষণা শুভেন্দুর! দুর্গাপুজোর আগে কী সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য?
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইউনানের এই নতুন রাডারের নজরে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্রও চলে আসতে পারে। ওড়িশার ড. এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে নিয়মিত অগ্নি-৫, কে-৪ এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়। এই পরীক্ষাগুলির প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে পারলে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পর্কে মূল্যবান ধারণা পেতে পারে চিন। যদিও ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও দীর্ঘপাল্লার নজরদারি প্রযুক্তির কারণে ভবিষ্যতে আরও উন্নত অ্যান্টি-সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে তথ্য গোপন রাখা এবং কৌশলগত সক্ষমতা সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই রাডারের গুরুত্ব শুধু ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলেও চিনের নজরদারি ক্ষমতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারত মহাসাগর ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় নৌবাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই গিয়েছে। ফলে এই এলাকায় নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে পারলে চিন কৌশলগতভাবে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত মহাসাগরে চিনের নৌ-উপস্থিতি এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এই নতুন রাডার সেই আলোচনাকেও আরও জোরালো করেছে।

আরও পড়ুন: ছিটকে গেলো আয়োজক মেক্সিকো! ১০ জনে হয়েও দুর্দান্ত জয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টারে কেনের ইংল্যান্ড
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ইউনানের আগে শিনজিয়াং এবং করলা অঞ্চলেও একই ধরনের দূরপাল্লার রাডার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে চিন (China)। ফলে নতুন LPAR যুক্ত হওয়ায় তাদের সামগ্রিক নজরদারি নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও এই রাডারের কার্যকারিতা বা প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সরকারি স্তরে এখনও কোনও মন্তব্য করা হয়নি, তবুও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ভারতের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি, অ্যান্টি-সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা এবং মহাকাশভিত্তিক নজরদারি সক্ষমতা আরও উন্নত করার উপর জোর দেওয়া হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত বদলে যাওয়া কৌশলগত পরিস্থিতিতে এই ধরনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা আগামী দিনে দুই দেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।













