বাংলাহান্ট ডেস্ক: চিনের উচ্চাভিলাষী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতের (India) উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বেজিং। এই নদীই অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে সিয়াং এবং পরে অসমে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। চিনের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় দিল্লির উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে পালটা পদক্ষেপ হিসেবে অরুণাচলে ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রোজেক্ট’ (SUMP) বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু করেছে ভারত সরকার। এই প্রকল্প সফল হলে তা শুধু ভারতের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রই হবে না, একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ তৈরি করছে চিন, পাল্টা কি পদক্ষেপ ভারতের (India)?
তিব্বতের মালভূমি থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদী দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ভারতের (India) উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জীবনরেখা হয়ে উঠেছে। অরুণাচল প্রদেশ ও অসমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, পানীয় জল, মৎস্যচাষ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকাংশেই এই নদীর উপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চিনের বিশাল বাঁধ চালু হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। গ্রীষ্মকালে নিম্ন অববাহিকায় জলপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কৃষিকাজের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি নদীবাহিত পলি পরিবহণ কমে গেলে পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জীববৈচিত্র্য এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এই পরিস্থিতিতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
আরও পড়ুন: প্রথমে IIT-তে সফল, পরে UPSC-তে বাজিমাত! শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেই স্বপ্নপূরণ কাজলের
চিন অবশ্য শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এর মাধ্যমে কোনও প্রতিবেশী দেশের ক্ষতি করার পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে ভারত সেই আশ্বাসে পুরোপুরি ভরসা করতে রাজি নয়। কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, নদীর উজানে এমন একটি বিশাল বাঁধ তৈরি হলে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কার্যত চিনের হাতে চলে যাবে। ভবিষ্যতে কোনও রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার পরিস্থিতিতে এই জলসম্পদকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার গোটা পরিস্থিতির উপর নিবিড় নজর রাখছে। লোকসভায় লিখিত উত্তরে কেন্দ্র ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চিনের সমস্ত কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রোজেক্ট বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রস্তাবিত এই প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ১১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভারতের জলবিদ্যুৎ খাতে এক নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। আনুমানিক ১.৫ লক্ষ কোটি টাকার এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমনভাবে নকশা করা হচ্ছে যাতে আকস্মিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জল সংরক্ষণ এবং নদীর প্রবাহে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবকাঠামোগত শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি এটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও আরও মজবুত করবে।

আরও পড়ুন: কড়া টক্কর পাবে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম? ভিডিও বানিয়ে রোজগারের জন্য স্বদেশি অ্যাপ আনছে Jio
গত কয়েক বছর ধরে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত (India)। তথ্য আদান-প্রদান, স্বচ্ছতা এবং নদী প্রকল্প নিয়ে আগাম পরামর্শের বিষয়েও দিল্লি বারবার বেজিংয়ের কাছে দাবি জানিয়েছে। যদিও সেই প্রচেষ্টায় এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি নিজস্ব পরিকাঠামো শক্তিশালী করার পথেই হাঁটছে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রোজেক্ট শুধু একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ। ভারতের জলসম্পদ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে আগামী দিনে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

















