বাংলা হান্ট ডেস্ক : রাজ্য সরকার পরিবর্তনের পর সবদিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার মধ্যে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলছে। এর মাঝেই বিএড কলেজ (B.Ed College) নিয়ে উঠে এল এক অন্য ছবি। বিএড কলেজের নামে চলছে কার্যত ‘ডিগ্রি বিক্রির কারবার’! কোথাও কলেজের অস্তিত্বই নেই, কোথাও আবার একটি ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমকেই দেখানো হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে। পরিদর্শনে গিয়ে এমনই একাধিক চিত্র দেখে রীতিমতো হতবাক রাজ্যের শিক্ষা দফতর।
বিএড কলেজগুলি (B.Ed College) নিয়ে উঠছে অভিযোগ
সরকারি নজরদারিতে ধরা পড়েছে, রাজ্যের বহু বিএড প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম পরিকাঠামোও নেই। অথচ কাগজে-কলমে সেগুলি দিব্যি চলছে। এই পরিস্থিতিতে আর কোনওরকম ঢিলেমি দিতে চাইছে না সরকার। রাজ্যজুড়ে বিএড কলেজগুলির পরিকাঠামো এবং পঠনপাঠনের মান যাচাই করে যে রিপোর্ট সামনে এসেছে, তাতে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই ৪৫০-র বেশি কলেজকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে আরও কড়া পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। রাজ্যের বিএড শিক্ষাব্যবস্থার আসল চেহারা জানতে সরেজমিনে যাচাই শুরু করেছিল দফতর। নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামো এবং শিক্ষাদানের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়।
১০০ নম্বরের সেই মূল্যায়নে রাজ্যের কলেজগুলির গড় স্কোর মাত্র ৫১.৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকের সামান্য বেশি নম্বর পেয়েই থেমে গিয়েছে গড় মান। পরিদর্শনের সময় এমন কিছু তথ্য সামনে এসেছে, যা গোটা ব্যবস্থার উপরেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ৫৩টি কলেজের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে পরিদর্শকেরা প্রতিষ্ঠানটির কোনও অস্তিত্বই পাননি। কোনও জায়গায় দেখা গিয়েছে অন্য কাজ চলছে, আবার কোথাও গিয়ে মিলেছে তালাবন্ধ বাড়ি। ফলে ওই কলেজগুলি আদৌ কীভাবে এতদিন কার্যক্রম চালিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু তাই নয়, ১৭টি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নিয়েও সামনে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। কলেজ হিসেবে যে জায়গার জন্য অনুমোদন বা এনওসি রয়েছে, বাস্তবে সেখানে রয়েছে ফ্ল্যাট কিংবা ড্রয়িং রুম। একই ভবনে শুধুমাত্র নামের বোর্ড পরিবর্তন করে বিএডের পাশাপাশি পলিটেকনিক এবং ফার্মাসি কলেজ থাকার ছবিও ধরা পড়েছে পরিদর্শনে। আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে কলেজগুলির পারফরম্যান্স নিয়ে। ১১৪টি প্রতিষ্ঠান ১০০-র মধ্যে ৩০ নম্বরও তুলতে পারেনি।
পরিকাঠামো এবং অন্যান্য ঘাটতির পাশাপাশি ভুয়ো ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলিকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৬৫টি কলেজকে কার্যত অচল প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রাখা হয়েছে। এর বাইরে আরও ১২১টি বিএড কলেজের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। সেখানে পরিকাঠামোর ঘাটতি এতটাই প্রকট যে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে নিয়ম মেনে চলবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে গোটা চিত্র যে সম্পূর্ণ হতাশাজনক নয়। পরিদর্শনে ১৫১টি কলেজ তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে। তাদের প্রাপ্ত নম্বর ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে সিসিটিভি ব্যবস্থা, শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর মতো বিষয়গুলি অপেক্ষাকৃত সন্তোষজনক বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে।
বিএড শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে পরিকাঠামো না থাকা বা নির্ধারিত ঠিকানায় প্রতিষ্ঠান খুঁজে না পাওয়ার ঘটনা সামনে আসায় পূর্ববর্তী প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের তথ্য মিলেছে, তাদের ক্ষেত্রে এবার কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজ্যের বিশিষ্ট মহল।