বাংলা হান্ট ডেস্ক: ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে আরও একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যুক্ত হল। কল্পনা চাওলা, সুনীতা উইলিয়ামস ও রাজা চারির পর এবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভশ্চর অনিল মেনন (Anil Menon)। মঙ্গলবার কাজাখস্তানের ঐতিহাসিক বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে রাশিয়ার (Russia) সয়ুজ এমএস-২৯ মহাকাশযানে চড়ে তিনি মহাকাশের পথে রওনা দেন। এটি অনিলের জীবনের প্রথম মহাকাশ অভিযান। রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থা রসকসমসের ‘এক্সপিডিশন-৭৫’ মিশনে তিনি ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার এবং ক্রু সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন অভিজ্ঞ রুশ মহাকাশচারী পিওতর দুব্রভ এবং আনা কিকিনা। প্রায় আট মাস আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (International Space Station) অবস্থান করে তাঁরা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং মানবদেহের উপর মহাকাশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অংশ নেবেন।
মহাকাশে পাড়ি দিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মহাকাশচারী অনিল (Anil Menon):
অনিল মেননের (Anil Menon) এই যাত্রা শুধু নাসার আর একটি নিয়মিত মিশন নয়, বরং ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ও মহাকাশচারীদের সাফল্যের ধারাবাহিকতারও প্রতীক। চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং মহাকাশচারী— তিনটি পরিচয়ই সমান দক্ষতার সঙ্গে বহন করছেন তিনি। নাসা জানিয়েছে, মহাকাশে তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার তত্ত্বাবধান, স্টেশনের প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি চিকিৎসা সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান। একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা মহাকাশ অভিযানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় মহাকাশে অবস্থানকারী নভশ্চরদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে যে গবেষণা চলছে, সেখানে অনিলের চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন: রুশ তেল কেনার ‘শাস্তি’ দিতে নতুন চাল! ১০০ শতাংশ শুল্কের নয়া বিল আমেরিকার, নিশানায় ভারত-সহ ৫ দেশ
অনিল মেননের জীবনের পথচলাও কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে জন্ম হলেও তাঁর শিকড় রয়েছে ভারত ও ইউক্রেনে। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। মিনেসোটার সেন্ট পল অ্যাকাডেমি অ্যান্ড সামিট স্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউরোবায়োলজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর এবং স্ট্যানফোর্ড মেডিক্যাল স্কুল থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি লাভ করেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। জরুরি চিকিৎসায় রেসিডেন্টশিপ সম্পূর্ণ করার পাশাপাশি ওয়াইল্ডারনেস মেডিসিনেও বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং মহাকাশ প্রযুক্তির মতো তিনটি কঠিন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে আয়ত্ত করার এই বিরল দক্ষতাই তাঁকে নাসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশচারীতে পরিণত করেছে।
নাসায় যোগ দেওয়ার আগে দীর্ঘদিন মার্কিন বিমানবাহিনীতে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অনিল। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া এবং জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে মহাকাশ অভিযানের জন্য আরও উপযুক্ত করে তোলে। ২০১৪ সালে নাসায় যোগ দেওয়ার পর তিনি একাধিক মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সয়ুজ টিএমএ-১৩এম, সয়ুজ টিএমএ-১৭এম এবং সয়ুজ এমএস-৬ অভিযানে ডেপুটি ক্রু সার্জন ও প্রাথমিক ক্রু সার্জন হিসেবে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়। এছাড়া তাঁর ঝুলিতে রয়েছে এক হাজার ঘণ্টারও বেশি উড়ানের অভিজ্ঞতা, যা মহাকাশচারী হিসেবে তাঁর দক্ষতার আরেকটি বড় প্রমাণ।

আরও পড়ুন: এবার বাংলার স্কুল–শিক্ষকরাও পাবেন সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা ও সুবিধা! বড় ইঙ্গিত শমীকের
বিশ্বজুড়ে মহাকাশ গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সময়ে অনিল মেননের (Anil Menon) এই অভিযান বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে আগামী আট মাসে তিনি এবং তাঁর সহযাত্রীরা এমন একাধিক গবেষণা করবেন, যার ফল ভবিষ্যতের চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে তাঁর এই সাফল্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় সম্প্রদায়ের জন্যও গর্বের মুহূর্ত। কল্পনা চাওলা ও সুনীতা উইলিয়ামসের মতো অনিল মেননও নতুন প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবেন। তাঁর এই প্রথম মহাকাশযাত্রা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।













