বাংলাহান্ট ডেস্ক: রাশিয়ায় (Russia) শুরু হতে চলেছে এমন এক বৈজ্ঞানিক অভিযান, যা সফল হলে মানবজীবনের ধারণাই বদলে যেতে পারে। বার্ধক্যকে ধীর করা, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সংকট দূর করা এবং মানুষের আয়ু বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিশাল গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার। ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজি’ নামে এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ২.৪৭ লক্ষ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, জিন থেরাপি, বায়োপ্রিন্টিং, কৃত্রিম অঙ্গ নির্মাণ এবং ক্রায়োথেরাপির মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হবে। রুশ প্রশাসনের দাবি, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
২.৪৭ লক্ষ কোটির প্রকল্পে রাশিয়ায় (Russia) শুরু বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াই
গত এপ্রিল মাসেই রাশিয়ার (Russia) বিজ্ঞান ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি জানিয়েছিলেন, দেশটির বিজ্ঞানীরা এমন এক ধরনের জিন থেরাপি নিয়ে কাজ করছেন যা মানবদেহের কোষের বয়স বৃদ্ধির হার কমাতে সক্ষম হতে পারে। সেই গবেষণারই বিস্তৃত রূপ হল এই নতুন প্রকল্প। রুশ সরকারের মতে, মানুষের শরীরে বার্ধক্যের প্রভাব যতটা সম্ভব ধীর করা গেলে বহু জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। প্রশাসনের দাবি, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই গবেষণার ফলাফল ব্যবহার করে প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করা যেতে পারে। যদিও এই দাবি এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবুও প্রকল্পটি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: অপেক্ষার অবসান! ভারতে কোন চ্যানেলে দেখা যাবে ফুটবল বিশ্বকাপ? বিবেকানন্দকে স্মরণ করে জানাল সংস্থা
এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বায়োপ্রিন্টিং প্রযুক্তি। থ্রিডি প্রিন্টারের সাহায্যে জীবন্ত টিস্যু এবং অঙ্গ তৈরি করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছেন রুশ বিজ্ঞানীরা। তাঁদের বক্তব্য, পরীক্ষাগারে মানুষের তরুণাস্থি এবং ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি করতে তাঁরা সফল হয়েছেন। আগামী লক্ষ্য হল ২০৩০ সালের মধ্যে মানবদেহে এই ধরনের কৃত্রিমভাবে তৈরি অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা। একইসঙ্গে জিনগতভাবে পরিবর্তিত বিশেষ প্রজাতির ক্ষুদ্রাকৃতির শূকরের শরীরে মানুষের যকৃৎ, কিডনি এবং হৃদপিণ্ডের মতো অঙ্গ উৎপাদনের কাজও শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে অঙ্গদাতার অভাব দূর করতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
অমরত্ব বা দীর্ঘায়ুর এই গবেষণার সঙ্গে পুতিনের ব্যক্তিগত আগ্রহের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট বহু বছর ধরেই পেপটাইড থেরাপি এবং ক্রায়োথেরাপির মতো পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। রুশ বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির খাভিনসনের তৈরি বিশেষ পেপটাইড চিকিৎসা বার্ধক্য প্রতিরোধে কার্যকর বলে দাবি করা হয়েছে। খাভিনসনের মতে, এই থেরাপির মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ১২০ বছর পর্যন্ত সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারেন। যদিও এই দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে মতভেদ রয়েছে, তবুও রাশিয়ায় এ ধরনের গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
ক্রায়োথেরাপিও এই প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ। এই পদ্ধতিতে মানবদেহকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রার মধ্যে কিছু সময়ের জন্য রাখা হয়। জানা গিয়েছে, মাইনাস ১১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় শরীরকে নিয়ে গিয়ে কোষের ক্ষয় রোধের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। অস্ট্রিয়ার প্রাক্তন চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্জ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ২০১৮ সালে পুতিন ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে এই থেরাপির সুফল ব্যাখ্যা করেছিলেন। ফলে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রকল্প হিসেবেই নয়, ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকেও পুতিন দীর্ঘায়ু সংক্রান্ত গবেষণাকে উৎসাহ দিচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন:আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মাঝেই বড় সাফল্য ভারতের! এই দেশের সঙ্গে কার্যকর হল বাণিজ্য চুক্তি
রাশিয়ার (Russia) এই প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পুতিন ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একটি পুরনো কথোপকথনও। গত বছর বেজিংয়ে এক সামরিক অনুষ্ঠানে দুই নেতাকে মানুষের আয়ু ১৫০ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে শোনা গিয়েছিল। সেই সময় বিষয়টি সাধারণ আলাপচারিতা বলে মনে হলেও, বর্তমানে রাশিয়ার এই বিশাল বিনিয়োগ সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রকল্পটির নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের চিকিৎসক-কন্যা মারিয়া ভোরোন্তসোভা এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মিখাইল কোভালচুক। তাঁদের নেতৃত্বে রাশিয়া এখন এমন এক ভবিষ্যতের সন্ধান করছে, যেখানে বার্ধক্য আর অনিবার্য পরিণতি নয়, বরং বিজ্ঞানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়া হয়ে উঠতে পারে।













