বাংলাহান্ট ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের (Ali Khamenei) মৃত্যু ঘিরে গোটা পশ্চিম এশিয়ায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তাঁর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে তা আরও একবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ৪ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে তাঁর ছয় দিনব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, যা চলবে ৯ জুলাই পর্যন্ত। শেষ দিনে তাঁর জন্মভূমি ও শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র শহর মাশহাদে দাফন করা হবে। ইরানি প্রশাসনের দাবি, এই কয়েক দিনে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নামতে পারেন। এত বিপুল জনসমাগমের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে রাজধানী তেহরান-সহ গোটা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আয়াতুল্লাহ খামেনেই চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা (America) ও ইজরায়েলের (Israel) যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন বলে ইরানের দাবি। সেই ঘটনার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং একাধিক কূটনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়।
আলি খামেনেইয়ের (Ali Khamenei) শেষকৃত্যে কড়া নিরাপত্তা, ইরানজুড়ে জারি হাই অ্যালার্ট:
ইতিমধ্যেই খামেনেইয়ের মরদেহ তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনের সামনে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করছেন এবং শোকপ্রকাশ করছেন। ৪ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মরদেহ সেখানে রাখা হবে। ৬ জুলাই তেহরানের প্রধান সড়ক দিয়ে বিশাল শোকমিছিল বের হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ৭ জুলাই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে শিয়া ইসলামের অন্যতম ধর্মীয় কেন্দ্র কোম শহরে। ৮ জুলাই প্রতিবেশী ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় বিশেষ ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। সবশেষে ৯ জুলাই মাশহাদের ঐতিহাসিক ইমাম রেজা মাজার চত্বরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে প্রয়াত নেতাকে। এই দীর্ঘ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইরানের বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
আরও পড়ুন:বাংলাদেশ-মায়ানমারের ওপর ভর করে ভারতের পূর্ব সীমান্তে অতি তৎপরতা চিনের! কী পরিকল্পনা দিল্লির?
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশবাসীর উদ্দেশে এই শেষকৃত্যে ব্যাপক সংখ্যায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এই শোকযাত্রা শুধু একজন নেতাকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান নয়, বরং দেশের ঐক্য ও সংকল্পেরও প্রতীক। খামেনেইয়ের (Ali Khamenei) মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনেই নতুন সুপ্রিম লিডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন না বলে ইরানি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনেইকে প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা গিয়েছে। ফলে এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে তাঁর নিরাপত্তা নিয়েও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছে ইরান। ভারত থেকেও একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছবে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিহারের রাজ্যপাল লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ আতা হাসনাইন, কেন্দ্রীয় বিদেশ প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটা, প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, কংগ্রেস নেতা পবন খেরা, পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি এবং জম্মু-কাশ্মীরের বিশিষ্ট শিয়া ধর্মীয় নেতা আগা সৈয়দ হাসান মোসাভি আল সাফাভি। এছাড়াও রাশিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান-সহ একাধিক দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। এই বিপুল আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, খামেনেইয়ের মৃত্যু শুধু ইরানের নয়, গোটা অঞ্চলের ভূরাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

আরও পড়ুন: সীমান্ত শক্তি বাড়াতে বড় পদক্ষেপ! ভারত কিনছে ৫২,০০০ কোটির সমরাস্ত্র, তালিকায় থাকছে কী কী?
অন্যদিকে, এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের কারণে আমেরিকার সঙ্গে চলতে থাকা পরোক্ষ শান্তি আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেহরান। কাতারের মধ্যস্থতায় যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, তা ৯ জুলাই দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। যদিও সম্প্রতি দোহায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে খামেনেইয়ের (Ali Khamenei) শেষকৃত্য শুধু একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং আগামী দিনে পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, তারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। তাই তেহরানের দিকে এখন নজর শুধু ইরানের জনগণের নয়, বিশ্বের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলেরও।













