বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারত (India)-পাকিস্তান (Pakistan) সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে একাধিক সংঘাত ও যুদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে কূটনৈতিক সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের দ্রুত বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে মুখ খুলেছেন পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী (Ahmed Sharif Chaudhary)। আল আরাবিয়া ইংলিশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ভারতের উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রচলিত হামলা সক্ষমতা পাকিস্তানের কাছে কতটা উদ্বেগের বিষয়। জবাবে তিনি জানান, ইসলামাবাদ ভারতের সামরিক সক্ষমতাকে ‘সম্মান’ করে এবং নয়াদিল্লি নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যে বিনিয়োগ করছে, সে বিষয়টিও তারা বুঝতে পারে। তবে তাঁর দাবি, পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে কোনও অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে না এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার উপরই জোর দিচ্ছে।
ভারতের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির প্রসঙ্গে কী জানাল পাকিস্তান (Pakistan)?
চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের (Pakistan) নীতি মূলত প্রতিরক্ষামুখী এবং কোনও দেশের বিরুদ্ধে তাদের ‘আগ্রাসী উদ্দেশ্য’ নেই। তাঁর মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন ভারতীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং বহুস্তরীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একের পর এক কর্মসূচি এগোচ্ছে। গত জুলাইয়ে ডিআরডিও ‘কুশা’ দীর্ঘপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম পরীক্ষামূলক উড়ান সম্পন্ন করে। ওড়িশার এপিজে আবদুল কালাম দ্বীপ থেকে হওয়া ওই পরীক্ষায় উচ্চগতির ও উচ্চ-উচ্চতার একটি বৈদ্যুতিন লক্ষ্যবস্তু সফল ভাবে প্রতিহত করা হয়। কুশা প্রকল্পে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যার দীর্ঘতম সংস্করণের পাল্লা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোয় ইতিমধ্যেই আকাশ, আকাশ-এনজি, কিউআরএসএএম এবং ভিএসএইচওআরএডিএস-এর মতো দেশীয় ব্যবস্থা রয়েছে। এর পাশাপাশি ব্রহ্মোস ভারত-রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এবং এমআরএসএএম ভারত ও ইজরায়েলের সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে। কৌশলগত ক্ষেত্রে অগ্নি ও কে-সিরিজের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ এবং এগুলিকে সম্প্রতি দেশীয় শিল্পের জন্য খোলা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে না। বরং ২৫ অগস্ট প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানায়, ডিআরডিও-র তৈরি সমস্ত প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি যোগ্য ভারতীয় সংস্থাগুলিকে উৎপাদনের জন্য হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি সংস্থা ও MSME-গুলির অংশগ্রহণ আরও বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যও রয়েছে।
দেশীয় কর্মসূচির পাশাপাশি ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশলে রাশিয়ার সঙ্গেও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দিল্লি সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একাধিক প্রস্তাব সামনে আসে। তার মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৬০টি Su-30MKI যুদ্ধবিমানের আধুনিকীকরণ করে ‘সুপার সুখোই’ করার পরিকল্পনা, যার আনুমানিক ব্যয় ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ৮৪টি বিমানকে আপগ্রেড করার কথা রয়েছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে ভারতে Su-57 পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের যৌথ উৎপাদন, অতিরিক্ত S-400 ব্যবস্থা এবং S-500 নিয়ে সহযোগিতার প্রস্তাবের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। পাশাপাশি ভারতে S-400-এর রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল বা MRO পরিকাঠামো তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।

আরও পড়ুন: ট্রাম্প জানালেন শুভেচ্ছা! পুতিন করলেন প্রশংসা, মোদীর জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে শুভেচ্ছার বন্যা
অন্যদিকে, ভারত নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট বা AMCA প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে দেশীয় প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে রাশিয়ার মতো দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগীদের সঙ্গে প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম নিয়ে কাজ—দুই পথেই এগোচ্ছে নয়াদিল্লি। পাকিস্তানের (Pakistan) সামরিক মুখপাত্রের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সমীকরণের মধ্যেই বিশেষ তাৎপর্য পাচ্ছে। তবে পাকিস্তান যে ভারতের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নেই—এটি তাঁর বক্তব্য; দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও কৌশলগত নীতির তুলনা আলাদা বিষয়। ফলে ইসলামাবাদের এই অবস্থান ভবিষ্যতে দুই প্রতিবেশী দেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে।













