বাংলাহান্ট ডেস্ক: মহাকাশ (Space Mirror) প্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে আমেরিকা। পৃথিবীতে সূর্যাস্তের পরও অতিরিক্ত সূর্যালোক পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ রিফ্লেক্ট অরবিটালকে পরীক্ষামূলকভাবে মহাকাশে একটি বিশাল আয়না বসানোর অনুমতি দিয়েছে মার্কিন ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন (FCC)। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে Earendil-1 মহাকাশযানের মাধ্যমে প্রায় ৬০ ফুট আকারের একটি প্রতিফলক আয়না পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে পাঠানো হবে। এই আয়নাটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে সূর্যাস্তের পরও পৃথিবীর নির্দিষ্ট অংশে আলো পৌঁছে দেবে। প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে হাজার হাজার এমন আয়না মহাকাশে স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই উদ্যোগকে অনেকেই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
বিজ্ঞানীদের সতর্কতা অগ্রাহ্য করে মহাকাশে আয়না (Space Mirror) বসানোর অনুমতি:
রিফ্লেক্ট অরবিটালের দাবি, এই প্রযুক্তি মূলত সৌরশক্তির ব্যবহার আরও কার্যকর করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মহাকাশে (Space Mirror) স্থাপিত আয়না সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে অতিরিক্ত সময় ধরে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে আলো সরবরাহ করতে পারবে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, কৃষিকাজ, দুর্যোগ মোকাবিলা, উদ্ধার অভিযান, দুর্গম এলাকায় আলোকসজ্জা এবং জরুরি নির্মাণকাজেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে সংস্থার দাবি। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৪০০ মাইল উচ্চতায় স্থাপিত আয়নাটি পৃথিবীর প্রায় তিন মাইল ব্যাসার্ধের একটি অঞ্চলকে আলোকিত করতে সক্ষম হবে। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের ১৮০ ফুটের আয়না তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যা পূর্ণিমার একশোটি চাঁদের সম্মিলিত আলোর সমান আলো প্রতিফলিত করতে পারবে বলে সংস্থার দাবি।
আরও পড়ুন: ভারতের ওপর ফের ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব আমেরিকার! কী বার্তা দিল নয়াদিল্লি?
তবে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ঘিরে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। মহাকাশ বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবিদদের একাংশ মনে করছেন, কৃত্রিমভাবে রাতের আকাশে আলো ছড়িয়ে দেওয়া হলে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত প্রতিফলিত আলো বিমান চলাচলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক দিন-রাতের জৈবিক ছন্দ বা সার্কেডিয়ান রিদমেও প্রভাব ফেলতে পারে। পরিযায়ী পাখির চলাচল, বন্যপ্রাণীর আচরণ, এমনকি গাছপালার ফুল ফোটার সময়সূচিও বদলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজিনার মহাকাশ বিজ্ঞানী সামান্থা এল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, রাতের আকাশ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে কৃত্রিম আলো যুক্ত হলে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এই উদ্বেগের কথা জানিয়ে সম্প্রতি আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটি ও FCC-কে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটির পুনর্বিবেচনার আবেদন জানায়। তাদের বক্তব্য, মহাকাশ গবেষণা, পরিবেশ এবং জনস্বার্থের উপর সম্ভাব্য প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে FCC জানিয়েছে, তারা আপাতত শুধুমাত্র পরীক্ষামূলকভাবে একটি আয়না উৎক্ষেপণের অনুমতি দিয়েছে। তাদের ভূমিকা মূলত স্যাটেলাইট ব্যবহারের লাইসেন্স প্রদান এবং রেডিও যোগাযোগে সম্ভাব্য বিঘ্ন বা মিশন শেষে মহাকাশযান নিরাপদে অপসারণের বিষয়টি নিশ্চিত করা। পরিবেশগত বা সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন তাদের আওতার মধ্যে পড়ে না বলেও সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে। রিফ্লেক্ট অরবিটালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বেন নাওয়াক এই অনুমোদনকে ভবিষ্যতের মহাকাশ প্রযুক্তির জন্য বড় সাফল্য বলে উল্লেখ করেছেন।

আরও পড়ুন: খেলেছিলেন এবারের বিশ্বকাপে! মাত্র ২৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন তরুণ ফুটবলার
রিফ্লেক্ট অরবিটাল ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও এই পরিষেবা দিতে চায়। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সময় আলো সরবরাহের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। সংস্থার মতে, সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। তবে মহাকাশে আয়না পাঠানোর ধারণা একেবারে নতুন নয়। ১৯৯৩ সালে রাশিয়াও সাইবেরিয়ায় অতিরিক্ত আলো পৌঁছে দিতে পরীক্ষামূলকভাবে একটি প্রতিফলক আয়না মহাকাশে পাঠিয়েছিল। সেই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত সফল না হলেও, তিন দশক পরে আমেরিকা আরও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে একই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখন এই পরীক্ষামূলক প্রকল্প কতটা সফল হয় এবং এর সুফল ও সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, সেদিকেই নজর থাকবে গোটা বিশ্বের (Space Mirror)।













