বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারত (India) ও শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka) দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হল। প্রায় ৩৮ বছর পর ভারতের কোনও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে শ্রীলঙ্কার মাটিতে পা রাখলেন রাজনাথ সিং (Rajnath Singh)। মঙ্গলবার তিন দিনের সফরে কলম্বোয় পৌঁছন তিনি। শেষবার ১৯৮৮ সালে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কে সি পান্ত শ্রীলঙ্কা সফর করেছিলেন। তারপর এত দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও ভারতের কোনও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আর দ্বীপরাষ্ট্রে সরকারি সফরে যাননি। ফলে রাজনাথের এই সফরকে শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে ভারত-শ্রীলঙ্কা প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন পর্ব হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ। একইসঙ্গে ভারত মহাসাগরে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের আবহে সফরটির কৌশলগত গুরুত্বও যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রীলঙ্কা সফরে রাজনাথ সিং (Rajnath Singh)
কলম্বোয় পৌঁছনোর পর বন্দরনায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাজনাথকে স্বাগত জানান শ্রীলঙ্কার উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) অরুণা জয়াসেকারা এবং শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সন্তোষ ঝা। সফরের আগে রাজনাথ জানিয়েছিলেন, শ্রীলঙ্কা সরকারের একাধিক শীর্ষ আধিকারিকের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব, ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত যোগাযোগ এবং ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির পাশাপাশি ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও শ্রীলঙ্কা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে আলোচনাই এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে চলেছে (Rajnath Singh)।
আরও পড়ুন:ফের মিথ্যাচার! ভারতের ৩২ টি বায়ুসেনা ঘাঁটি ধ্বংসের AI ভিডিও বানাল পাকিস্তান, বিশ্বজুড়ে হাসির রোল
রাজনাথের এই সফরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের সম্পর্কের একটি জটিল অতীতও। ১৯৮০-র দশকে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ এবং তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এলটিটিই-র সশস্ত্র তৎপরতা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৮৭ সালে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে চুক্তির পর ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী দ্বীপরাষ্ট্রে মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে ভারতীয় বাহিনী সরাসরি এলটিটিই-র সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী শ্রীলঙ্কা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। সেই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ফের কোনও ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কলম্বো সফর হওয়ায় অতীতের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান নিরাপত্তা সমীকরণ—দুই দিক থেকেই সফরটির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি নজর রয়েছে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত সমীকরণের দিকে। এই অঞ্চলে গত কয়েক বছর ধরে চিনের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়ছে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বেজিংয়ের ঘনিষ্ঠতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হাম্বানটোটা বন্দর। দ্বীপরাষ্ট্রের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য চিনের সংস্থার লিজে রয়েছে। ফলে ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছে চিনের এই উপস্থিতি দিল্লির জন্য স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়। সেই কারণেই রাজনাথের শ্রীলঙ্কা সফরকে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ওষুধের কারখানা থেকে দোকান; বাদ নেই কিছুই! বাতিল ৮৮০ লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে তুকারাম মুন্ধের দাপট
সব মিলিয়ে প্রায় চার দশকের বিরতির পর রাজনাথ সিংয়ের (Rajnath Singh) কলম্বো সফর ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ বার্তা বহন করছে। একদিকে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা পেরিয়ে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও মজবুত করার চেষ্টা, অন্যদিকে ভারত মহাসাগরে পরিবর্তনশীল শক্তির ভারসাম্য—দুই বিষয়ই এই সফরের কেন্দ্রে রয়েছে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ভারতের যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে কলম্বোর সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার বার্তাও এই সফর দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তাই ৩৮ বছর পর কোনও ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর শ্রীলঙ্কা সফর নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং ভারত মহাসাগরের বদলে যাওয়া ভূ-রাজনীতিতে দিল্লির সক্রিয় অবস্থানেরও ইঙ্গিত।













