নতুন ইতিহাস ভারতের! সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি দিল প্রথম বেসরকারি রকেট বিক্রম-১

Published on:

Published on:

India's first private rocket, Vikram-1, successfully launched into space.
Follow

বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে যুক্ত হল এক নতুন অধ্যায়। শ্রীহরিকোটার উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে শনিবার দুপুর প্রায় ১২টা নাগাদ ‘মিশন আগমন’-এর অধীনে সফলভাবে মহাকাশের উদ্দেশে রওনা দিল স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের তৈরি ‘বিক্রম-১’ (Vikram-1)। এটিই ভারতের (India) প্রথম বেসরকারিভাবে নির্মিত অরবিটাল রকেট, যা দেশের মহাকাশ শিল্পে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের মতে, এই উৎক্ষেপণ শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, বরং গত কয়েক বছরে মহাকাশ খাতে নেওয়া নীতিগত সংস্কারের বাস্তব ফলাফল। দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভরশীল এই ক্ষেত্র এখন বেসরকারি উদ্যোগের হাত ধরেও দ্রুত এগিয়ে চলেছে, আর সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে বিক্রম-১।

সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি দিল ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট বিক্রম-১ (Vikram-1)

বিক্রম-১ (Vikram-1) প্রযুক্তিগত দিক থেকেও অত্যন্ত আধুনিক একটি রকেট। সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট কাঠামো দিয়ে তৈরি এই রকেটটি লো আর্থ অরবিটে প্রায় ৩৫০ কেজি পর্যন্ত পেলোড বহন করতে সক্ষম। এতে রয়েছে শক্তিশালী সলিড-ফুয়েল বুস্টার এবং অত্যাধুনিক থ্রিডি-প্রিন্টেড লিকুইড ইঞ্জিন, যা উৎক্ষেপণের দক্ষতা আরও বাড়িয়েছে। এই অভিযানে স্কাইরুটের নিজস্ব ‘স্কোপ’ উপগ্রহের পাশাপাশি জার্মানির DCUBED, ভারতের গ্রহ স্পেসের SOLARAS S3 এবং কস্মোসার্ভের ‘এমব্রেস’ নামে একটি রোবোটিক আর্ম মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রতীকীভাবে ‘কসমিক ব্লুম’ নামে একটি শিল্পকর্ম এবং ১৮ ক্যারেট সোনার তৈরি একটি ক্ষুদ্র রকেটও বহন করছে বিক্রম-১, যেখানে সি. ভি. রমন, বিক্রম সারাভাই এবং ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালামের ক্ষুদ্র ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে। বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধন মিশনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

আরও পড়ুন: সোনমের পর এবার অভিজিৎ! অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনের ঘোষণা ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতার

এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে গত কয়েক বছরে মহাকাশ খাতে সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত পরিবর্তন। ২০২৩ সালের ইন্ডিয়ান স্পেস পলিসি কার্যকর হওয়ার পর উপগ্রহ নির্মাণ, উৎক্ষেপণ পরিষেবা, মহাকাশ প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বাণিজ্যিক পরিষেবা—প্রায় গোটা ভ্যালু চেইনই বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি IN-SPACe-কে একক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যা অনুমোদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ISRO-র অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ এবং শিল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত সংস্থাটির কাছে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান নথিভুক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৩৩টি অনুমোদন এবং ১০৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালে ভারতীয় স্পেস স্টার্টআপগুলির জন্য প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পথও সুগম করেছে IN-SPACe।

সংস্কারের ইতিবাচক প্রভাব দেশের মহাকাশ শিল্পের পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। ২০১৪ সালে যেখানে ভারতে মাত্র একটি স্পেস স্টার্টআপ ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪০০-রও বেশি হয়েছে। বর্তমানে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির আকার প্রায় ৮.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতকে ৪০ থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। এই লক্ষ্য পূরণে স্টার্টআপ ও MSME-দের জন্য চালু হয়েছে সিড ফান্ড স্কিম, যেখানে যোগ্য সংস্থাগুলিকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে এক হাজার কোটি টাকার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড এবং ৫০০ কোটি টাকার টেকনোলজি অ্যাডপশন ফান্ড, যাতে নতুন প্রযুক্তির গবেষণা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়ানো যায়।

India's first private rocket, Vikram-1, successfully launched into space.

আরও পড়ুন: অন্ধকার করে আসছে আকাশ, আগামী দু’ঘণ্টায় ঝড়-বৃষ্টির দাপট দক্ষিণবঙ্গের ৫ জেলায়!

একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে মহাকাশ খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের নিয়মও অনেকটাই শিথিল করা হয়েছে। নতুন নীতিতে স্যাটেলাইট উৎপাদন ও পরিচালনায় ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত অটোমেটিক FDI, স্পেসপোর্ট প্রকল্পে ৪৯ শতাংশ এবং স্যাটেলাইটের যন্ত্রাংশ ও সাব-সিস্টেম তৈরিতে ১০০ শতাংশ অটোমেটিক FDI-র অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের বিশ্বাস, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগের এই সমন্বিত উদ্যোগ ভারতকে আগামী দিনে বিশ্বের অন্যতম প্রধান মহাকাশ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রথম বড় প্রতীক হিসেবেই ইতিহাসে স্থান করে নিল বিক্রম-১ (Vikram 1)—যা শুধু একটি রকেটের সফল উৎক্ষেপণ নয়, বরং আত্মনির্ভর ভারতের মহাকাশ স্বপ্নকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।