বাংলাহান্ট ডেস্ক: একজন অচেনা বৃদ্ধার চোখের জল যে একজন তরুণের জীবন বদলে দিতে পারে, শুভম ভাইসারের সাফল্যের গল্প (Success Story) যেন তারই জীবন্ত প্রমাণ। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, তাঁর বাবা একজন জেলা বিচারক হিসেবে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সমস্যার সমাধান করছেন। আদালতের একটি রায় কীভাবে কারও জীবনকে নতুন পথে এগিয়ে দিতে পারে, তা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। তবে জীবনের মোড় ঘুরে যায় একটি বিশেষ ঘটনার পর। সেই ঘটনাই তাঁকে প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখায়। দীর্ঘ অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য মানসিক শক্তির জোরে শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণও করেন শুভম। ২০২১ সালের UPSC সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় মেধাতালিকায় ৯৭তম স্থান অর্জন করে তিনি ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (IAS) যোগ দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তাঁর স্ত্রীও ২০২২ ব্যাচের একজন আইএএস অফিসার এবং তিনি পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শুভম ভাইসারের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
শুভমের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির একটি এসেছিল এক ৭৫ বছর বয়সি বৃদ্ধার সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে। একদিন ওই বৃদ্ধা হাতে একটি সাধারণ সবজিভর্তি ব্যাগ নিয়ে শুভমদের বাড়িতে আসেন। তিনি বিচারক বাবার জন্য সেই সবজি উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শুভম তাঁকে জানান, তাঁর বাবা কোনও ধরনের উপহার গ্রহণ করেন না। এই কথা শুনেই বৃদ্ধার চোখে জল চলে আসে। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, তাঁর কাছে দেওয়ার মতো মূল্যবান কিছু নেই। কিন্তু শুভমের বাবার দেওয়া একটি রায় তাঁর জীবনটাই বদলে দিয়েছে। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবেই তিনি সামান্য এই উপহার নিয়ে এসেছেন। সেই দৃশ্য এবং বৃদ্ধার চোখের জল শুভমের মনে গভীর ছাপ ফেলে। তিনি উপলব্ধি করেন, সৎভাবে দায়িত্ব পালন করলে রাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের জীবনে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। সেই দিনই তিনি স্থির করেন, তিনিও এমন একটি দায়িত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছাতে চান, যেখান থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব (Success Story)।
আরও পড়ুন:দীর্ঘ ৮ মাস থাকবেন স্পেস স্টেশনে! মহাকাশে পাড়ি দিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মহাকাশচারী অনিল
এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ প্রস্তুতির পথ। ইউপিএসসির মতো কঠিন প্রতিযোগিতায় সাফল্য পাওয়া সহজ ছিল না। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। মোট ছয়বার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাঁচবারই সফলভাবে UPSC উত্তীর্ণ হন, যা নিজেই একটি বিরল নজির। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের পরীক্ষায় ৯৭তম স্থান অর্জন করে IAS হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেন। এই সাফল্যের পেছনে ছিল নিরন্তর পরিশ্রম, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন এবং সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার। শুভম বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি ছোট সুযোগকেই কাজে লাগাতে পারলে বড় লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। তাই চাকরির পাশাপাশি প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি কখনও পিছিয়ে যাননি।
চাকরি সামলে UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অফিসে যাওয়া ও ফেরার সময়টুকুও তিনি নষ্ট করতেন না। যাতায়াতের পুরো সময় সংবাদপত্র ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পড়তেন, যাতে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের প্রস্তুতি স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে যায়। অফিস থেকে ফিরে বিশ্রামের বদলে তিনি সরাসরি পড়ার টেবিলে বসে যেতেন। পরীক্ষার আগে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পুনরাবৃত্তি করার জন্য আগেভাগেই সমস্ত ছুটি জমিয়ে রাখতেন। তাঁর মতে, নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি শেষ মুহূর্তের রিভিশনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সময় ব্যবস্থাপনা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

আরও পড়ুন: রুশ তেল কেনার ‘শাস্তি’ দিতে নতুন চাল! ১০০ শতাংশ শুল্কের নয়া বিল আমেরিকার, নিশানায় ভারত-সহ ৫ দেশ
আজ শুভম ভাইসারের জীবনকাহিনি অসংখ্য UPSC পরীক্ষার্থীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর গল্প শুধু একটি পরীক্ষায় সফল (Success Story) হওয়ার নয়, বরং মানুষের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার, অধ্যবসায় এবং সৎ উদ্দেশ্যের গল্প। একজন অচেনা বৃদ্ধার কৃতজ্ঞতার অশ্রু তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রকৃত মূল্য মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত। সেই উপলব্ধিকে পাথেয় করেই তিনি নিজের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন এবং অদম্য পরিশ্রমের মাধ্যমে তা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। আজ তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে, জীবনের কোনও ছোট ঘটনা কখনও কখনও ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণায় পরিণত হতে পারে।













